Latest: শিক্ষা দিবসের চেতনা ও বর্তমান বাস্তবতা

Latest: শিক্ষা দিবসের চেতনা ও বর্তমান বাস্তবতা

সময়টি ১৯৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। ‘টাকা যার শিক্ষা তার’ এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করে শিক্ষাকে একটি বিশেষ শ্রেণির হাতে তুলে দেয়ার প্রস্তাবসহ একটি সাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতি এদেশের জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দিতে চাইল তৎকালীন আইয়ুব সরকার। এই চরম বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে সদাজাগ্রত ছাত্রসমাজ সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখ হরতাল আহ্বান করে এবং এর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে পেশাজীবী, শ্রমিক, কৃষকসহ সর্বস্তরের মানুষ। ইতোমধ্যে বাঙালির আড়মোড়া ভাঙতে শুরু করে দিয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল এটি শুধু ছাত্রদের শিক্ষা সম্পর্কিত আন্দোলন নয়, বরং এটি স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলনের মাহেন্দ্রক্ষণ।
১৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় বের হয় ছাত্র-জনতার বিরাট মিছিল। মিছিলটি যখন হাইকোর্ট পার হয়ে আব্দুল গণি রোডে প্রবেশ করে তখনই অতর্কিত পুলিশ গুলিবর্ষণ শুরু করে। রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে বাবুল, গোলাম মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহসহ নাম না জানা অনেক ছাত্র। পিচঢালা রাজপথ রক্তে সিক্ত হলো। রাজপথকে নরকপুরীতে পরিণত করে পিছু হটল স্বৈরাচার আইয়ুব শাহী সরকার। পারল না তার বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে। পরবর্তী সময় একটি গণমুখী শিক্ষানীতি প্রবর্তনের দাবিতে আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। আর ১৭ সেপ্টেম্বর ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতিবিজড়িত দিনটি প্রতিষ্ঠা পায় ‘জাতীয় শিক্ষা দিবস’ হিসেবে।
বর্তমান বাস্তবতা : দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম করে আমরা পেয়েছি একটি মানচিত্র, স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি লাল সবুজের পতাকা। পেয়েছি একটি শিক্ষা দিবস। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই দিবসটি এখন বাম প্রগতিশীলরা ছাড়া কেউ মনে রাখে না। এমনকি এদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে যে দিনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সেই দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করাও হয় না। শিক্ষা ও ছাত্র আন্দোলনের তাৎপর্যপূর্ণ এই ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরই অজানা ইতিহাসের এ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের কথা। তারা বঞ্চিত এর তাৎপর্য অনুধাবন থেকে। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা দিবসের ৫৮ বছর পরও ছাত্রসমাজের সর্বজনীন শিক্ষার যে আকাক্সক্ষা তা আজো পূর্ণ হয়নি। কিছুটা সংশোধন হলেও সেই ব্রিটিশ-পাকিস্তানি আমলে কেরানি কর্তৃক নির্মিত শিক্ষাব্যবস্থা এখনো বহাল আছে। শিক্ষা এখনো বাজারে উঠে। তবে পার্থক্য একটিই। আগে বিক্রি হতো খোলা বাজারে আর এখন বিক্রি হয় শোরুমে। হু-হু করে বাড়ছে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন স্কুল-কলেজ, যেখানে পড়তে প্রয়োজন প্রচুর অর্থ। যেখানে দেশের অধিকাংশ মানুষের পক্ষে পড়ানো অসম্ভব।
অবশেষে উন্নতির পথে অগ্রসর হতে গিয়ে আমরা পেয়েছি জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১১ যেখানে চমৎকার প্রাঞ্জল ভাষায় কৌশলে দেয়া হয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। শিক্ষা দিবসের চেতনায় উঠে আসা সর্বজনীন, বৈষম্যহীন, একই ধারার বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে শিক্ষাকে করা হয়েছে বেসরকারিকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ। এ যেন নতুন বোতলে সেই পুরনো মদ! যার প্রভাবে সারাদেশে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা সর্বস্তরেই চরম নৈরাজ্য চোখে পড়ছে।
তাৎপর্যপূর্ণ মহান শিক্ষা দিবসের ইতিহাস মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই দিনটি পালনের উদ্যোগ নেয়া উচিত। শিক্ষা দিবসের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে গ্রাম ও শহরের মাঝে শিক্ষা বৈষম্য দূর করতে হবে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সরকারি প্রণোদনার আওতায় আনতে হবে। হাওর, বাঁওড়, পাহাড় ও দুর্গম অঞ্চলকে কমিউনিটি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের আওতায় আনার কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সান্ধ্যকালীন কোর্স বাতিল করে দ্বিতীয় শিফট চালু এবং সমন্বিত বা গুচ্ছ পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষা নিতে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে। তবেই ৬২’র মহান শিক্ষা দিবসের সব শহীদের আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য সফল হবে।

সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী,
যশোর জেলা শাখা।
[email protected]

ডিসি

Source link

Follow and like us:
0
20

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here