Latest: ভালোবাসা অনুরূপ – Bhorer Kagoj

Latest: ভালোবাসা অনুরূপ – Bhorer Kagoj

শামসুন্নাহার হলের সামনে জটলা! কি হয়েছে! একটি মেয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে! হলের ফটকে জটলা। রায়হান বিকেলে এই পথ দিয়েই যাচ্ছিল। ভিড় ঠেলে সহপাঠী ক’জন নিয়ে ধরাধরি করে মেয়েটিকে হাউস টিউটর রুমে নিয়ে গিয়ে বসালো। তারপর সহপাঠী একজনের কাছে জানলো অসুস্থ মেয়েটি দ্বিতীয় বর্ষ ভূগোলের শিক্ষার্থী। মেয়েটির মাইগ্রেন রয়েছে।
– প্রচণ্ড মাথাব্যথা নিয়ে রুম থেকে বের হতে নেই সিস্টার! বিপদ হতে পারতো!
– আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। মাথার যন্ত্রণায় কাতর মেয়েটি রায়হানকে বললো আস্তে করে কৃতজ্ঞতার ভঙ্গিতে।
মেয়েদের ছাত্রীনিবাস। ছেলেদের হলের ভিতরে ঢোকা নিষেধ! তাই রায়হান বের হয়ে গেল শিক্ষক রুম থেকে। কুমুরও রয়েছে প্রচণ্ড মাইগ্রেন যন্ত্রণা! মাঝে মাঝে মাথার ব্যথাটা এমন পর্যায়ে যায় যেন দেয়ালে মাথা ঠুকিয়ে পরিত্রাণ হয়। বিষয়টি বেশ ক’বার প্রত্যক্ষ করেছে রায়হান।
হাকিম ভাইয়ের চা স্টলে গিয়ে বসলো। চাপানের পর সে ক্যাপেস্টান সিগারেট ধরালো। হলের বন্ধু হিমুনের এ সিগারেট বেশ পছন্দ। ছুটির দিনে দুপুরে ডাইনিংয়ে এক সঙ্গে খেয়ে ওরা দু’জন সস্তার ক্যাপেস্টান ধরায়। এই সিগারেটের তামাকের ঘ্রাণটা রায়হানকে আকুল করে। হিমুন বলে সিগারেট মানুষকে চিন্তা ও বুদ্ধির খোরাক দেয়। দ্রুত সিদ্ধান্তের পথ দেখায়। ইদানীং রায়হান বেশ সিগারেট পান করে! সুখটান দিতে দিতে ভাবতে থাকলো কুমুর কথা। কীভাবে কুমুকে বলবে তাকে তার বেশ ভালো লাগে! মাত্রাতিরিক্ত তামাক সেবনেও কোন পথ খুঁজে পায় না সে! সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতর দিয়ে হাঁটতে শুরু করলো সে। সন্ধ্যার টিউশনিতে যোগ দিতে মালিবাগ রেলগেটের দিকে পা বাড়ায় সে। কীভাবে নিবেদনটা করবে আজও বাথরুমে মনে মনে মহড়া দিয়েছে রায়হান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে রায়হান। রায়হান সম্মান ২য় বর্ষের ছাত্র। কলা ভবনের পাশে হলে থেকে পড়াশুনা করে। সংস্কৃতিমনা। প্রগতিশীল ভাবধারায় দীক্ষিত। বেশ সাধারণ তার চলাফেরা। কুমিল্লা শহরে বাড়ি। অনেক ভাইবোন। সবাই মেধাবী। বৃত্তির টাকা এবং পাশাপাশি টিউশনি করে পড়াশুনা করে রায়হান।
রায়হান একটি নাট্য সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। টিএসসিতে সে সংগঠনের মঞ্চ নাটকের মহড়াতে গিয়ে কুমকুমের সঙ্গে তার পরিচয়। কুমকুমও একই নাট্য সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কুমকুম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অনাসের্র ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী। থাকে ঢাকার মালিবাগের বাগানবাড়িতে। ওদের দেশের বাড়ি বরিশাল। ওরা ৩ বোন। বাবা চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। আত্মপ্রত্যয়ী এবং পোশাকে বেশ রুচিশীল। কথাবার্তায় ওর রাখঢাক নেই। বেশ ঠোঁটকাটা।
নাটক মহড়া কিংবা ক্যাম্পাস, আর্টস ক্যাফেটোরিয়া, টিএসসি, পাবলিক লাইব্রেরি, ব্রিটিশ কাউন্সিল, বিশ্ববিদ্যালয় পাঠাগারে দেখা হয় দু’জনের। পড়াশুনা, ছাত্র পড়ানো এবং মঞ্চ নাটকের বাইরে রায়হানের খুব একটা সময় হাতে থাকে না। কিন্তু কুমকুমের তা নয়। ক্লাস আর নাটক। রায়হানের সঙ্গে একদিন দেখা না হলেই পাগল হয়ে পড়ে কুমকুম।
ক’দিন দেখা হয় না দু’জনের। টিউশনি থেকে ফেরায় পথে সন্ধ্যায় কুমকুমের সঙ্গে রায়হানের দেখা মালিবাগ রেলগেটে। কুমকুম রায়হানকে ওদের বাসায় নিয়ে যায়। কুমকুমের পীড়াপীড়িতে রায়হান ওইদিন রাতে ওদের বাসায় খাওয়া দাওয়া করে।
হলের ডাইনিংয়ের রেশনে পাওয়া ইট পাথরে মেশানো চালের ভাত ও ডাল সম্পর্কে কুমকুমও বেশ ভালোই জানে! শামসুন্নাহার হলের অনাবাসিক ছাত্রী কুমকুম। আবাসিক সহপাঠী বান্ধবীর অনুরোধে সেও দু’একবার এ হলের ডাইনিংয়ে দুপুরের খাবার খেয়েছে।
– হলের ডাইনিংয়ের খাবার খেতে ভালো লাগে আপনার?
– না খেয়ে উপায় আছে? রায়হান উত্তর দিলো। পাঁচটি আইটেম! বেশ সময় নিয়ে কুমকুম রায়হানকে খাওয়ালো।
সপ্তাহে ৩ দিন পড়ায় রায়হান। হলে ফেরার পথে প্রায় সময়ই রেলগেটের কাছে কুমকুম রায়হানের জন্য অপেক্ষা করে। এভাবে দু’জনের সম্পর্ক গাঢ় হয়। নাটকের মহড়া শেষে কুমকুম একদিন রায়হানকে বলে আমরা প্রায় সমবয়সি। আপনি আপনি বলা আর ভালো লাগে না! কুমকুম রায়হানকে বললো, আজ থেকে আমরা পরস্পরকে তুমি বলবো! এ কথা শুনে রায়হানের মধ্যে কেমন যেন মমতামাখা অনুভ‚তি!
রায়হান বললো, ‘আমি কুমুই ডাকবো আপনাকে। তবে ‘তুমি’ করে বলতে পারবো না। বেশ লজ্জা করে’। পড়াশুনার পাশাপাশি লেখালেখি, নাটক ও সংস্কৃতি চর্চা ছাড়া অন্য কিছু বুঝে না রায়হান। শিক্ষিত পরিবারের মা-বাবার কড়া শাসন ও অন্য ভাইবোনদের মতো অন্যদিকে রায়হানের দৃষ্টি নেই।
মাঝে মাঝে কুমুকে এড়িয়ে চলে রায়হান। রায়হানের অভিমত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের এসব মানায় না! মহিলা সমিতি মিলনায়তনে মঞ্চ নাটকের নিয়মিত প্রদর্শনী শেষে একদিন কুমকুম রায়হানকে চটপটি খাওয়ানোর জন্য বেশ অনুরোধ করে। কিন্তু রায়হান কিছুতেই খায় না।
ওইদিন রাতে বৃষ্টিতে ভিজে হলে ফিরে রায়হান। পরদিন রায়হানের জ্বর আসলো খুব। চারদিন ক্যাম্পাস, টিএসসি, লাইব্রেরি কোথাও রায়হানের দেখা নেই। উতলা কুমকুম! সকালে রায়হানের হলে গিয়ে কুমকুম দেখে রায়হান কাঁথা মুড়ে শুয়ে প্রলাপ বকছে। কুমু রায়হানকে তার বাসায় নিয়ে আসতে চাইলো। কিন্তু রায়হান বললো, সমস্যা নেই, সেরে যাবো!
রায়হানের বড় সমস্যা সে মেয়েদের বেশ ভয় পায়। ভালোবাসা বা প্রেমের বিষয়ে ওর ভয়ের কারণ রায়হান বন্ধুদের বলেছে একাধিকবার। কালো রংয়ের ছেলে তারপর গরিবের সন্তান! ভালোবাসা এদের মানায় না!
ঠিক তার উল্টো কুমকুম। বেশ সাহসী। অবিবাহিতা একটা মেয়ে রায়হানের মতো অবিবাহিত একটা ছেলেকে বাসায় এনে শুশ্রুষা করতে চায়!
যে মেয়েটা ওর অসুস্থতার সময় পাগলের মতো ছুটে এসেছে রায়হানের হলে, পাঁচদিন ধরে খোঁজ নেই তার! টিউশনিতে যাবার পথেই কুমকুমদের বাসা। তাই কুমুর খবর নিতে গেলো ওদের বাসায়। গৃহে শুধু ছোট বোন ও কুমু ছাড়া কেউই নেই।
কলিংবেল টিপতেই কুমকুমের ছোট বোন দিয়া দরজা খুলে দিলো। দিয়া রায়হানকে বললো, বড় আপুর মন খুব খারাপ। আপনি বসুন, আপুকে ডেকে দিচ্ছি।

নিকট প্রতিবেশী ও কুমকুমের অন্তরঙ্গ বান্ধবী নীরা আজ সকালে মারা গেছে! নীরা ভালোবাসতো শাহরিয়ারকে। কিন্তু উভয়ই ছিল চাপা স্বভাবের। নীরা অব্যক্ত থেকেছে। তেমনি শাহরিয়ারও সরাসরি নীরাকে বলেনি তার ভালোবাসার কথা। অপ্রকাশিত ভালোবাসার এ অবস্থা ওদের অনেকদিনের।
ড্রয়িং রুমে সোফায় রায়হানের কাছে এসে বসলো কুমকুম। চেহারা বেশ মলিন। মনে হয় অনেকদিন ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করেনি কুমকুম।
– কি হয়েছে আপনার? রায়হান বললো।
– নীরা আজ সকালে মারা গেছে! ঘুমের ওষুধ খেয়ে।
– বলেন কী! ও নীরা! যার কথা আপনি প্রায়ই বলতেন? বেশ অন্তর্মুখী সেই বান্ধবীটা? শব্দহীন কুমকুম মাথা নাড়ায়।
– কেন কি দুঃখ ছিল তার?
শাহরিয়ারকে নীরা প্রচণ্ড ভালোবাসতো। কিন্তু কোনোদিন মুখ ফুটে বলতে পারেনি সে। শাহরিয়ারকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছিল নীরা। এক সপ্তাহের অধিক যোগাযোগ ছিল না ওদের। এই বিষণœতা থেকেই নীরার চলে যাওয়া। জীবন প্রস্থান!
– ভালোবাসার ব্যাপারে নীরাকেই এগিয়ে আসা উচিত ছিল। তাহলে তো নীরার অকাল মৃত্যু হতো না! রায়হানের এমন কথা শুনে সপ্রতিভ হয়ে উঠলো কুমকুম।
– না না এ বিষয়ে ছেলেদেরই এগিয়ে আসা উচিত। কুমকুমের উত্তরে রায়হানের মৃদু প্রতিবাদ।
– অবশ্যি এক্ষেত্রে মেয়েদের আগে প্রকাশ করা জরুরি! রায়হান কুমুর দিকে পলকহীন চোখে তাকায়।

এসআর

Source link

Follow and like us:
0
20

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here