Latest: পরাধীনতার জালে সম্পর্কের রসায়ন – West Bengal News 24

Latest: পরাধীনতার জালে সম্পর্কের রসায়ন – West Bengal News 24

হৃদয় কার না ভেঙ্গেছে! হৃদয় ভাঙ্গার কোনো শব্দ হয় না। যদি হতো তবে একেকটি হৃদয় ভেঙ্গে যাওয়ার শব্দে হয়তবা পৃথিবী বিদীর্ণ হয়ে যেত। কেউ বলে হৃদয় কাঁচের মত। প্রিয়জনের আঘাতে নাকি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। আবার কখনো শুনি- হৃদয় নাকি পাথর হয়ে গেছে। শত আঘাতেও আর ভাঙ্গে না। কাঁচের হৃদয় কী করে পাথর হয়ে যায়? হয়, হয়। কাঁচের হৃদয় পাথর হয় ভালোবাসার বিনিময়ে প্রতারিত হলে। আবার পাথরের হৃদয় কাঁচের মত হয় ভালোবাসা পেলে। কী অদ্ভুত এই হৃদয়! কত রহস্য ভরা এই মনোজগত! এই হৃদয়ের অধিকারী প্রত্যেক সৃষ্টি। মানুষ সে নারী বা পুরুষ সবাই যার যার হৃদয়ের মালিক।

এই নারী-পুরুষ সময়ের পরিক্রমায়, জৈবিক নিয়মে, সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় একসময় জীবনসঙ্গী পেতে চায়। কাছে পায়। এরপর নিজের হৃদয়ের পাশাপাশি সে তার জীবনসঙ্গীর হৃদয়ের একচ্ছত্র মালিক হতে চায়। সঙ্গী বা সঙ্গিনী যদি স্বেচ্ছায় দিতে না চায় তখনই শুরু হয় যুদ্ধ। এক মনের সাথে আরেক মনের, এক ইচ্ছার সাথে আরেক ইচ্ছার। হৃদয়, অন্তর, মন, যে নামেই ডাকি না কেন! এটা কি আর বস্তু? যে চাইলো আর অমনি দিয়ে দিলাম। রবীন্দ্রনাথের নায়ক অপু হৈমন্তীকে পেয়ে বলেছিলেন, আমি ইহাকে পাইলাম। সে আমার সম্পত্তি নয়, সে আমার সম্পদ। কী পেয়েছিল সে? শরীর নাকি হৃদয়? হৃদয় পেয়েছিল। হৃদয় পাওয়া নিজের যোগ্যতায় বা নিজের উপার্জনের টাকায় সম্পদ কেনার মতো মূল্যবান।

সম্পত্তি পাওয়া হয় উত্তরাধিকার সূত্রে যাতে কোনো রকম কষ্ট করতে হয় না। এই রকম পাওয়ায় নিশ্চয়তা আছে কিন্তু আত্মতৃপ্তি নেই। ঠিক তেমনি বিয়ে করে একজন মানুষের শরীর পাওয়া মানেই একই সাথে খুব দ্রুত তার হৃদয়ও পেয়ে যাবো এমনটা নয়। এমনটি হয়ও না সহজেই। একজন মানুষ কখনো আরেকজন মানুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয় না। তাকে অর্জন করে নিতে হয়। তবেই সে সম্পদ হয়। আমাদের দম্পতিদের মধ্যে তখনই দ্বন্দ্ব বাধে যখন সে অর্জন করা ছাড়াই পাশের মানুষটিকে সম্পদ ভাবা শুরু করে। যদি হয়েও যায় সে তার সম্পদ, তার মানে এই নয় যে তাকে যথেচ্ছা ব্যবহার করা যাবে বস্তুর মত। তাই কি? জীবনসঙ্গী বা সঙ্গীর মন, ভালোবাসা, যত্ন ইত্যাদি ইত্যাদি অর্জন করতে পারা যায় হয়ত।

আরও পড়ুন : বিয়ের প্রথম রাতে ভয় না পেয়ে যা করবেন নারীরা

তাই বলে তার ব্যক্তি সত্তাকে পারি কি? এটা একটা সহজ সত্য। যেটা আমরা মেনে নিই না। এটা মেনে নেয়া বা স্বীকার করা আমাদের জন্য চরম কঠিন হয়ে দাড়ায়। স্বামী চায় স্ত্রীকে সম্পূর্ণভাবে দখল করতে। শরীর, মন, স্বাধীনতা। আর স্ত্রীও চায় স্বামী তার একান্ত বাধ্যগত হয়ে যাক। তার কথায় উঠুক বসুক যাকে বলে আর কি (এমন চাওয়াটা বাড়াবাড়ি)। অর্থাৎ পুরো ব্যক্তির সবকিছুকে অধিকার করতে চায়। এই চাওয়াটা আসলে নারী-পুরুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এটা আসলে দোষেরও নয়। ভালোবাসলে আমরা সবটুকুই নিজের করে পেতে চাই। কিন্তু ব্যক্তি সত্তাকে অন্যায়ভাবে অধিকার করতে চাওয়াটা দোষের। কোনো স্বাধীন, সুশিক্ষিত মানুষ এভাবে ভাবতে পারে না বলেই আমি বিশ্বাস করি। এমন ভাবা এবং হওয়া একদমই কাম্য নয়। সম্ভবও নয়।

ব্যক্তিসত্তা বিসর্জন দিয়ে দিলেই কি সুখ আসবে? সুখী হয়ে গেলাম আমরা? এর মানে কী? ব্যক্তিসত্তা ব্যক্তির পারিপার্শ্বিক প্রভাবমুক্ত অস্তিত্ব, ব্যক্তির মূল বা বিশুদ্ধ অস্তিত্ব। নিজের ভেতরের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, চাহিদা, চাওয়া-পাওয়া, পছন্দ-অপছন্দ, নিজস্ব মতামত, সুখ, অনুভূতি সবকিছু মিলিয়েই তো! ছোট ছোট ইচ্ছেগুলো পর্যন্ত ভুলে যেতে হবে! ব্যক্তিসত্তা বিসর্জন দেয়া মানে এই যে নয় যে, বিয়ের পর আপনি সবসময়ই স্বামী বা স্ত্রীর পছন্দেই পোশাক পরবেন, সাজবেন, বেড়াতে যাবেন বা না যাবেন। ভালোবেসে তার আবদার রাখতেই পারেন নিঃসন্দেহে। তার পছন্দকে সম্মান করতে পারেন এবং করা উচিতও।

নীল শাড়ি বা নীল শার্ট মিলিয়ে পরতেই পারেন। কিন্তু সবসময়ই, আজীবনই তার ইচ্ছেতেই পোশাক পরা, তরকারির পদ রান্না করা, এটাকে কি ভালোবাসা বলে? তার হ্যাঁকে হ্যাঁ বলা। কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না নিতে পারা। মতামত না দিতে পারা, এসব কি ঠিক? এভাবে ভুলে যাওয়া কি নিজের জন্য খুব প্রয়োজন? এটা কি নিজের সত্তা ভুলে যাওয়া নয়? তিনিও স্বাধীনতার মানে জানলে আপনাকে তার পছন্দ চাপিয়ে দেবেন না। অনুগত হওয়া আর নিজের স্বাধীনতা বিলিয়ে তার দাস হওয়া একই কথা নয়। নিজেকে জড় বস্তু মনে করা কাম্য নয়। মানুষ কখনো জড় বস্তু হতে পারে না। জড়বস্তু সম্পত্তি হয় কিন্তু প্রাণী অর্থাৎ মানুষ কখনো একজন আরেকজনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারে না; কেননা তাদের নিজস্ব চিন্তা, চেতনা ও বোধ রয়েছে।

আরও পড়ুন : আজীবন যৌবন ধরে রাখতে সপ্তাহে মাত্র ১ বার ব্যবহার করুন ……

ব্যক্তিসত্তাকে আমরা চিরকালই উপেক্ষা করি। হোক সেটা নিজের বা অন্যের। পুরুষের বা নারীর। বিশেষ করে নারীদের। কি পুরুষ কি নারী, কারো কাছেই নারীর ব্যক্তিসত্তার কোনো মূল্য নেই। সেও যে একজন মানুষ তা পুরোপুরি ইগনোর করা হয় সযত্নে। সারাটা জীবন কাটে অন্যের মনো তুষ্টিতে। তাও কি সন্তুষ্ট করা যায়? তার ভালো লাগার দিকে কারো কোনো দৃকপাত হয় না। নারী যে কেবল নারী নয়, আলাদা ব্যক্তিসত্তা তা কে বা কজনে মানে? রবীন্দ্রনাথের ‘আমি মৃণালিনী নই’ উপন্যাসে মৃণালিনী অনুযোগ করে তার উপেক্ষিত ব্যক্তিসত্তার কথাই জানায়।” এই মুহূর্তে চোখের জলে বুক ভাসিয়ে আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করছে, আমি মৃণালিনী নই, আমি ভবতারিণী। রবিবাবুর স্ত্রী ছাড়াও আমার নিজস্ব একটা সত্তা ছিল, সেই সত্তার প্রতি রবিবাবু কোনো দিন সুবিচার করেনি।” নারীকে বস্তু ভাবা হয় সেই অন্ধকার যুগ থেকেই। প্রাণ আছে, জীবন আছে, বোধ আছে, অস্তিত্ব আছে এমনভাবে ভাবে না আমাদের সমাজ।

বস্তু হচ্ছে জড়। আপনি কোনো একটি বস্তু কেনেন যখন আপনার তা প্রয়োজন হয়। বা আপনার ইচ্ছে হলে বা কখনো এমনিতেই। আপনি বিয়ে করেন একাকীত্ব ঘোচানোর জন্য, প্রজন্ম তৈরির জন্য, সুখি হওয়ার জন্য। বস্তু আপনার ভালো না লাগলে এককোনায় ফেলে রাখেন বা পুরোনো হয়ে গেলে আরেকটা কিনে আনেন বা প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে ফেলে দেন। বস্তু জড়। এটা আপনার সম্পত্তি পৈতৃক সূত্রে হতে পারে বা আপনি নিজের টাকায় কেনা হতে পারে। মানুষ জড় নয়। জীব যার জীবন আছে। বোধ, আছে। তাকে তো আপনি জড়ের মতো ভাবতে পারেন না। জড়ের মতো ব্যবহার করতে পারেন না। তাকে কেনা যায় না। তাকে অর্জন করতে হয়। অর্জন করতে পারলে সে আপনার সম্পদ। আপনার সম্পদ হয়ে গেলেও তার আলাদা সত্তা আছে, স্বাধীনতা আছে যা জন্মগত, সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত।

কাউকে নিজের প্রয়োজনে পরিবর্তন করতে চাওয়াটা অন্যায়। জোর করে কাউকে পরিবর্তন করা যায় না। সে যা আছে তাকে সেভাবেই থাকতে দেয়া উচিত। তবে হ্যাঁ, যদি তার মধ্যে নেগেটিভটি থাকে এবং আপনি তাকে ভালো নিয়তে তার ভালোর জন্য তাকে পরিবর্তিত করতে চান সেটা অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং মানুষ হিসেবে কর্তব্য আমি মনে করি। কোনো পুরুষ বা নারী যদি চায় তার পাশের মানুষটিকে নিজের মনের মত পরিবর্তন করতে, তবে তার উচিত হবে- তাকে সময় দিন পরিবর্তিত হওয়ার। ইতিবাচক উপদেশ দিন আন্তরিকতার সাথে। বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করুন। আপনি তার কাছ থেকে কী চান তা বারবার আলোচনায় টেনে আনুন। তাকে স্বাধীন মানুষ ফিল করার সুযোগ দিন। একসময় সে তার নেতিবাচক দিক ঝেরে ফেলবে। আপনার পছন্দের পাত্র বা পাত্রী হবে। সময় সবকিছু ঠিক করে দেয়। পাথর শক্ত আর জল তরল, নরম। পাথরে ফোঁটা ফোঁটা জলের কণা দীর্ঘদিন ধরে পড়তে থাকলে একসময় ওই পাথরটি ক্ষয় হয়ে যায়। ভালোবাসা দিয়ে সব জয় করা যায় মনে হয়, তাই না? We know- Time is the best healer.

আরও পড়ুন : যে ৬ কথা স্ত্রীকে কখনোই বলবেন না

ইবনে তাইমিয়াহ (রা.) বলেন, পুরুষের হৃদয় যদি কোনো নারীর সাথে এঁটে যায়, যদিও সে নারী তার জন্য বৈধ হয়, তাহলেও তার হৃদয় থাকে ওই নারীর কাছে বন্দি। নারী তার অধিপতি হয়ে বসে, পুরুষ তার ক্রীড়নকে পরিণত হয়, যদিও সে প্রকাশ্যে তার অভিভাবক; কেননা সে তার স্বামী। তবে বাস্তবে সে নারীর কাছে বন্দি, তার দাস। বিশেষত নারী যদি জানতে পারে যে পুরুষ তার প্রেমে মুগ্ধ। এমতাবস্থায় নারী তার ওপর আধিপত্য চালায়, জালেম ও স্বৈরাচারী শাসক যেমন তার মাজলুম, নিষ্কৃতি পেতে অপারগ দাসের ওপর শাসন চালায়, ঠিক সেভাবেই নারী তার প্রেমে হাবুডুবু-খাওয়া পুরুষের ওপর শাসন চালায়। বরং এর থেকেও বেশি চালায়। এমনটি কখন হয়? ব্যক্তিসত্তাকে জলাঞ্জলি দিলেই এমন করুন পরিণতি হয় হোক সে নারী বা পুরুষ।

আর রূপবতী নারী (জ্ঞানী নয়) যদি আরও জানতে পারে যে, ওই পুরুষটির কোনো গোপন দুর্বলতা রয়েছে, যা সে নারীটির কাছ থেকে গোপন করতে চায়, তবে তো আর কথাই নেই। মানসিক অত্যাচার যেটা কথিত ভালোবাসা, আবদার ইত্যাদি দিয়ে মোড়ানো থাকে, তা আজীবন চলতেই থাকে ওই পুরুষটির ওপর। একজন হৃদয়বতী নারী কখনই এমন করবেন না এবং করেন না। হৃদয়ের বন্দিদশা শরীরের বন্দিদশা থেকে বহুগুণে মারাত্মক। হৃদয়ের দাসত্ব শরীরের দাসত্বের চেয়েও কঠিনতর।

যুগলজীবন শুরু করার শুরুতেই ভুল করলে সেই ভুল আর শোধরানো যায় না। আবেগের আতিশয্যে, ভালোবাসায় গদগদ হয়ে শুরুতেই সমুদ্রে ঝাপ দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সাতার না জানলে কেউই তীরে এসে পৌঁছাতে পারবেন না। নিজেদেরকে রক্ষা করাও সম্ভব নয়। ভালোবাসায় দিক্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অতি অনুগত হয়ে দাস বা দাসী হয়ে যাওয়া চরম বোকামি। উপলব্ধি যখন হবে তখন সময় হয়ত অনেক পেরিয়ে গেছে। রাজা বা রানী যেখানে হতে পারতেন, সেখানে দাস-দাসীর মত হয়ে থাকতে হতে পারে। অথবা স্বৈরাচারী রাজা বা রানী। নিজেকে ভুলে কোনো ভালোবাসাই ভালো নয়। ভালো ফল আনে না। নিজের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাড়ায়। শুরুতেই বেশি নত বা বেশী রুঢ় হলে অন্যায় করার সুযোগ তৈরি হয়। অনুগত হওয়া অবশ্যই বিশেষ গুন। কিন্তু সেই সাথে দৃঢ় থাকা খুব জরুরি। দাস বা দাসীর মত নয়, নিষ্ঠুর রাজা বা অবিবেচক রানীর মত নয়, ভালো মানুষের মত নিজেকে প্রকাশ করাই অধিকতর শ্রেয়। কথায় আছে- দড়ি বেশি টাইট দিলে ছিঁড়ে যায়। আবার বেশি আলগা রাখলে প্রিয় গরুটি হারিয়ে যায়। দুজনে মিলে বিশুদ্ধ এবং সুন্দর সম্পর্ক রাখা সম্ভব।

পরিশেষে একটি সত্য কথা। এখন সত্য যুগ নেই সেই আগের মত। কেউ কারো স্লেইভ হয় না। হতে চায়ও না। সবাই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। তবে আনফরচুনেটলি কিছু নারী-পুরুষ প্রাগতৈহাসিক যুগের হৃদয় নিয়ে জন্মে বসে আছে। তাদের শরীর-মন, সত্তা প্রস্তুত অন্যের দাস বা দাসী হওয়ার। তাদের জন্যই হয়ত এই লেখা। বেচারারা!

 Read on the original site 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here