Latest: প্রেমের দৈহিক মিলনই ডেকে আনে মৃত্যু

Latest: প্রেমের দৈহিক মিলনই ডেকে আনে মৃত্যু

প্রেমের দৈহিক মিলনই ডেকে আনে মৃত্যু - West Bengal News 24

বিশ্বাস ও অজস্র স্বপ্নের ওপর ভর করেই শুরু হয় একটি প্রেমের সম্পর্ক। কিন্তু পবিত্র প্রেম কয়টি হয়—এ প্রশ্ন থেকেই যায়। সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে যে, প্রেমের পবিত্রতা নষ্ট করে শারীরিক সম্পর্ক গড়ার মাধ্যমে। এতে প্রেম শুধু ভেঙেই যায় না; অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষণের পর মেরে ফেলা হয় কথিত ভালোবাসার মানুষকে।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ১০৮ জন নারী ধর্ষণের শিকারসহ ২৫৯ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। জানুয়ারি মাসে ধর্ষণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ৭ তারিখে রাজধানীর মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের পড়া শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং ২৯ জানুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর ধর্ষণের কারণে মৃত্যু ছিল আলোচিত ও আতঙ্কের।

ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, তারা পাঁচ বন্ধু মিলে উত্তরায় ব্যাম্বু রেস্টুরেন্টে গিয়ে মদপান করেন। অতিরিক্ত মদপান করায় তাদের মধ্যে এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন সে বাসায় ফিরে যায়। এরপর আরাফাত (২৮), রায়হান (২১), মাদুল ও ভিকটিম মেয়েসহ তাদের বন্ধু নুহাত আলম তাফসীরের (২১) বাসায় রাত কাটায়। সেখানে রাতে ভিকটিম মেয়েটার সঙ্গে রায়হানের শারীরিক সম্পর্ক হয়। তাদের মধ্যে পূর্ব থেকে সম্পর্ক ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, দেশে সামাজিক অস্থিরতার একটি সময় চলছে। অবস্থা আরও ভয়াবহ হবে। তিনি বলেন, সামাজিক ঐতিহ্য বা সামাজিক শিষ্টাচার তৈরি করতে গেলে রাষ্ট্র বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের সম্পর্ক, ব্যক্তিত্ব ও অবস্থানকে যেভাবে গুরুত্ব দেয়া দরকার সেভাবে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। বিচারের ক্ষেত্রে রয়েছে বৈষম্য। এ ছাড়া আমাদের বিচারহীনতার একটা সংস্কৃতি রয়েছে। মূল্যবোধের অভাবে এই ধরনের অনৈতিক সম্পর্ক সমাজে বেড়েই চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রেমিক যুগল বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, প্রেমের সম্পর্কের পর ভেঙে যাওয়াটা বেদনার। তারা বলেন, শারীরিক সম্পর্কের পর কোনো কারণে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া প্রক্রিয়াটিই ভীষণ স্বাভাবিক। বিচ্ছেদ স্বাভাবিক কেননা টান আর বিশ্বাস থাকে না। উভয়েই অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সারাদেশে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৪৬ জনকে। ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যা করেছেন আরো ৪৮ জন।

এ বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং মানবাধিকার নেত্রী সুলতানা কামাল বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিচারহীনতাই দায়ী। তবে রাষ্ট্র ও সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতার আরও অনেক উপাদান আছে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘ধর্ষণসহ নারীর প্রতি সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটে তার একটি অংশ জানা যায় না। এ বিষয়ে কোনো মামলা হয় না। আর যেগুলোর মামলা হয় বিশেষ করে ধর্ষণের ক্ষেত্রে সেখানে শতকরা মাত্র তিন ভাগ ঘটনায় শেষ পর্যন্ত অপরাধী শাস্তি পায়। আর ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় শাস্তি হয় মাত্র শূন্য দশমিক তিন ভাগ। তাহলে বোঝা যাচ্ছে এ ধরনের কোনো ঘটনায় বিচার হয় না।’

তবে এর বাইরেও আরও অনেক বিষয় আছে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশে সম্প্রতি আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা হলেও ধর্ষণের সংজ্ঞা একই আছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ধারা ৯(১)-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো পুরুষ বিবাহবন্ধন ব্যতীত (১৬ বছরের) অধিক বয়সের কোনো নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করে, অথবা [১৬ বছরের] কম বয়সের কোনো নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলে গণ্য হবেন।’

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান মনে করেন, ‘ধর্ষণে যে জোরপূর্বক বা বলপ্রয়োগের বিষয় থাকে তা এখানে অনুপস্থিত। প্রেমের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যখন শারীরিক সম্পর্ক হয় তখন সেটা ধর্ষণ নয়। কিন্তু পরে যখন বিয়ের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয় না তখন ধর্ষণ মামলা করা হয়। আমার বিবেচনায় এটা প্রতারণা। আমার মনে হয় আইনে এটার ব্যাখ্যা এবং আলাদা শাস্তির বিধান থাকা উচিত।’

মানবাধিকার কর্মী এবং মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘প্রেমের সম্পর্কে পারস্পরিক সম্মতিতে দৈহিক মিলনের পর বিয়ে করতে অস্বীকৃতি বড় ধরনের প্রতারণা। তবে আমার বিবেচনায় এটা ধর্ষণ নয়। বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে এই ধরনের প্রতারণার বিচার ও শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু যেহেতু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এটা ধর্ষণ তাই দণ্ডবিধির ওই ধারায় কেউ মামলা করেন না। সরাসরি ধর্ষণ মামলা করেন।’

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের এক শিক্ষার্থীর মা বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, কলাবাগানে দিহানের ঘটনার পর থেকে ইংলিশ মিডিয়ামের শিক্ষার্থীদের খারাপ চোখে দেখে। তিনি বলেন, কোনো মা-বাবা চায় না তার সন্তান খারাপ পথে চলবে, ধর্ষণের মতো খারাপ কাজ করবে। তিনি আরও বলেন, এই ধরনের ঘটনা সত্যি লজ্জার।

এর আগে বৃহস্পতিবার (৭ জানুয়ারি) সকালে দিহানের মোবাইল কল পেয়ে বাসা থেকে বের হন রাজধানীর ধানমন্ডির মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী আনুশকা নুর আমিন। এরপর আনুশকাকে কলাবাগানের ডলফিন গলির নিজের বাসায় নিয়ে যান দিহান। ফাঁকা বাসায় জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্কের একপর্যায়ে মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়লে দিহানসহ চার বন্ধু তাকে ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

গত ৭ জানুয়ারি রাতে নিহত ছাত্রীর বাবা বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯-এর ২ ধারায় ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ আনা হয়। মামলার একমাত্র আসামিকে সেদিন রাতেই গ্রেপ্তার করা হয়।

এ ছাড়াও রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে অতিরিক্ত মদপান করিয়ে ধর্ষণ করার অভিযোগ করে তার বাবা।

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছন থেকে বিবস্ত্র কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে সন্দেহভাজন হিসেবে পুলিশ খায়ের নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে। খায়েরকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ জানায়, মেয়েটির (মিম) সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের চুক্তি হয় ১০০ টাকার বিনিময়ে কিন্তু খায়েরের কাছে ছিল মাত্র ২০ টাকা। খায়ের বলে যে, তার কাছে আর কোনো টাকা নেই। মেয়েটি তখন নিমরাজি থাকলেও খায়েরের সঙ্গে শহীদ মিনারের পেছনের অন্ধকারে যান। খায়ের যখন তার কার্যসিদ্ধির চেষ্টা করেন তখন মিম বাধা দেয় যে পুরো টাকাই লাগবে। খায়ের তখন উত্তেজিত হয়ে জোরাজুরি করে কিন্তু মিম বেঁকে বসেন। তখনই খায়ের মারমুখী হয়ে জোর করে মিমকে বিবস্ত্র করে ধর্ষণচেষ্টা করে বলে ধারণা করা হয়। মিম তখন চিৎকার করা শুরু করলে চিৎকার বন্ধ করতে খায়ের মিমের গায়ে থাকা কালো রঙের ওড়না দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে ধরেন। মিম যখন নিস্তেজ হয়ে যায় তখন ছেড়ে দেন বলে ধারণা করা হয়।

এমন ঘটনায় উদ্বিগ্ন অভিভাবকসহ সমাজবিজ্ঞানীরা। ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ইশরাত জাহান আইমুন বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, সামাজিক অবক্ষয়ের কারণেই বিয়েবহির্ভূত অনেক ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে নারী-পুরুষ। আগে নৈতিকতাবোধ ছিল; আমরা অভিভাবকদের সম্মান করতাম যেগুলো এখন আর নেই। সবাই এখন নিজেদের অনেক বেশি স্বাধীন ভাবতে পছন্দ করে। এ ছাড়া স্ব স্ব ধর্মীয় মূল্যবোধকে না মানার কারণেও সমাজে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে মনে করেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, ইদানীং প্রেমের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। যার শেষ পরিণতি হচ্ছে মৃত্যু। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে আমরা কাউন্সিলিং করে থাকি। তবে করোনাকালীন এখন আপাতত এই কার্যক্রম বন্ধ আছে।

তিনি আরো বলেন, শুধু শাস্তি দিয়ে সব মোকাবিলা করা যাবে না। এর জন্য অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।

 Read on the original site 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here