ঢাকা, বুধবার, মে ২০, ২০২৬ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Logo
logo

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ানক সত্য: পশ্চিমের পতন নাকি তেহরানের নতুন এক সাম্রাজ্য?


আনন্দ খবর ডেস্ক     প্রকাশিত:  ১৯ মে, ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা এক ভয়ানক সত্য: পশ্চিমের পতন নাকি তেহরানের নতুন এক সাম্রাজ্য?

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আজ নীল নক্ষত্র আর লাল পতাকার সংঘাত। বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় আজ বারুদের তীব্র গন্ধ। কিন্তু আপনি যা দেখছেন, তা কি কেবলই একটি যুদ্ধ? নাকি এটি শতাব্দীর অন্যতম বড় এক ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত পর্যায়? আমরা আজ দাঁড়িয়ে আছি এমন এক মোড়ে, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের এই প্রথম পাঠটি কেবল যুদ্ধের ময়দান নিয়ে নয়; এটি আমেরিকার কৌশলগত গভীরতা, ইসরায়েলের সংকল্প আর তেহরানের ইস্পাতকঠিন ধৈর্যের এক জটিল উপাখ্যান।

বহু বছর ধরে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই সম্পর্ককে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা তুচ্ছ স্বার্থের চশমায় দেখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আজকের এই লেলিহান আগুন সেই ভুল বিশ্লেষণের মুখোশ খুলে দিয়েছে। আজ প্রমাণিত হয়েছে যে, আমেরিকা-ইসরায়েল জোট কেবল কাগজের চুক্তি নয়, বরং এটি একটি আদর্শিক এবং কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যুহ। কিন্তু এর বিপরীতে ইরান যা গড়ে তুলেছে, তা কি কেবল প্রতিরোধ? নাকি এক ধ্বংসাত্মক প্রতি আক্রমণ?

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, আমেরিকা আর তেহরানের এই শত্রুতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দশকের পর দশক ধরে সঞ্চিত হওয়া ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এই যুদ্ধের প্রথম শিক্ষা হলো আমেরিকার তথাকথিত 'নেতৃত্ব'। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সময় থেকেই ইরানকে সরাসরি মোকাবিলার যে পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল, আজ তা চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে। কিন্তু এই শক্তি প্রদর্শনের আড়ালে কি কোনো নৈতিক ভিত্তি আছে?

আমেরিকা বারবার দাবি করে আসছে যে, ইরান একটি স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা। তারা বলে, ১৯৮৩ সালে বৈরুতে মার্কিন মেরিন ব্যারাকে হামলা থেকে শুরু করে ইরাকে মার্কিন সেনাদের ওপর আক্রমণ—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে তেহরানের মদদপুষ্ট হেজবুল্লাহ বা অন্য প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো। আমেরিকার রক্ত নাকি তেহরানের হাতে লেগে আছে। কিন্তু নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে বসলে প্রশ্ন জাগে—মধ্যপ্রাচ্যের সার্বভৌম দেশগুলোতে দশকের পর দশক ধরে মার্কিন হস্তক্ষেপ কি বৈধ ছিল? কেন আজ ইরানকে তার নিজের সীমানার আশেপাশে আত্মরক্ষার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে?

ইসরায়েল এখানে কেবল একটি দেশ নয়, তারা পশ্চিমা শক্তির এক বিশাল দুর্গ। তারা দাবার ছক সাজায় পর্দার আড়াল থেকে। তারা ইরানের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে চায়, কারণ তারা জানে তেহরানের উত্থান মানেই মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান। কিন্তু ইরানও দমে যাওয়ার পাত্র নয়। তারা এই যুদ্ধের ময়দানে একা নয়। তাদের রয়েছে এক বিশাল প্রক্সি নেটওয়ার্ক—লেবানন থেকে ইয়েমেন, সিরিয়া থেকে ইরাক। এটি এমন এক মরণফাঁদ, যেখানে পা রাখলে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব।

উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর অবস্থান এখানে অত্যন্ত রহস্যময়। সংযুক্ত আরব আমিরাত বা বাহরাইনের মতো দেশগুলো ইসরায়েলের সাথে তথাকথিত 'আব্রাহাম অ্যাকর্ড' করলেও, তারা মনে মনে জানে যে ইরানকে শত্রু বানিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। তেহরান বারবার প্রমাণ করেছে যে, তারা চাইলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। আর হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়া মানে পুরো বিশ্বের হৃদপিণ্ড স্তব্ধ হয়ে যাওয়া। এই ভয়টিই পশ্চিমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

এই সংঘাত কি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেবে? না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের প্রতিটি কোণায়। যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনেই তেলের বাজারে যে অস্থিরতা দেখা গেছে, তা কেবল শুরু। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ হয়। যদি এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে নিউ ইয়র্ক থেকে টোকিও—প্রতিটি শহরে মুদ্রাস্ফীতির এক ভয়াবহ জোয়ার আসবে।

ইউরোপ আজ এক অদ্ভুত দোলাচলে। তারা একদিকে আমেরিকার মিত্র, অন্যদিকে তাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য তারা মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। আমেরিকা চায় ইউরোপও যেন এই যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে, কিন্তু ব্রাসেলস বা প্যারিস জানে যে এই যুদ্ধে জড়ানো মানে নিজের অর্থনীতিতে আত্মঘাতী গোল দেওয়া।

আমেরিকা বর্তমানে ইউক্রেন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে ব্যস্ত। এই পরিস্থিতিতে ইরানের সাথে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ তাদের জন্য এক বিশাল কৌশলগত বোঝা। তেহরান ঠিক এটাই চায়। তারা চায় আমেরিকাকে একটি দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধের চোরাবালিতে আটকে রাখতে। যাতে ওয়াশিংটন তার বৈশ্বিক মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। কৌশলগতভাবে ইরান এখানে অনেক বেশি পরিণত। তারা জানে কখন আঘাত করতে হয় এবং কখন পিছু হটে প্রতিপক্ষকে প্রলুব্ধ করতে হয়।

প্রশ্ন উঠছে—এই যুদ্ধের বিজয় কার? আমেরিকা এবং ইসরায়েল দাবি করছে তারা ইরানের সামরিক সক্ষমতা অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে। তাদের কমান্ড নেটওয়ার্ক তছনছ করে দিয়েছে। কিন্তু এটাই কি বিজয়? যুদ্ধ জয় কেবল প্রতিপক্ষের কয়েকটা বাঙ্কার ধ্বংস করার নাম নয়। যুদ্ধ জয় হলো একটি স্থায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা।

পশ্চিমা নীতিনির্ধারকরা বলছেন যে, এই যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। কারণ, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ মানেই ইরানের শক্তির পুনর্গঠন। কিন্তু তেহরানের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তারা এই যুদ্ধকে দেখছে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে। তারা জানে, যদি তারা একবার নতি স্বীকার করে, তবে পুরো মধ্যপ্রাচ্য মার্কিন করদরাজ্যে পরিণত হবে। তাই তারা পিছু হটছে না।

এক্ষেত্রে একটি বড় বিষয় হলো—আমেরিকা আর ইসরায়েল কি আসলে ইরানি জনগণকে তাদের সাথে নিতে পেরেছে? উত্তর হলো—না। প্রতিটি বোমা যখন তেহরান বা ইসফাহানের মাটিতে পড়ে, তখন সাধারণ ইরানিদের মনে পশ্চিমাদের প্রতি ঘৃণা আরও ঘনীভূত হয়। কোনো বিদেশি শক্তি কোনো জাতির ভাগ্য পরিবর্তন করে দিতে পারে না। অথচ আমেরিকা বারবার সেই একই ভুল করে চলেছে। তারা লিবিয়া, ইরাক এবং আফগানিস্তানে যা করেছে, ইরানেও সেই একই চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চাইছে।

এই যুদ্ধের প্রকৃত শিক্ষা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, শক্তির দম্ভ দিয়ে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়া যায় না। আমেরিকা এবং ইসরায়েল হয়তো সাময়িকভাবে যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে আছে, কিন্তু নৈতিক এবং কৌশলগত ময়দানে ইরান এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

আমেরিকা এবং ইসরায়েল ইরানের অস্পৃশ্য থাকার মিথ ভেঙে দিয়েছে—একথা যেমন সত্য, তেমনি ইরানও প্রমাণ করেছে যে তারা পশ্চিমাদের নাকে খত দেওয়াতে জানে। এখন সময় এসেছে বড় শক্তিগুলোর চিন্তা করার। যুদ্ধ কি সমাধান? না কি এটি কেবল নতুন এক ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা?

ইরানের ভবিষ্যৎ কোনো পশ্চিমা সামরিক জেনারেলের ডেস্কে লেখা হবে না। এটি লেখা হবে তেহরানের রাস্তায়, মেহনতি মানুষের মিছিলে এবং সেই সমস্ত দেশপ্রেমিকদের হাতে যারা মনে করে তাদের দেশ কারো গোলামি করবে না। এই যুদ্ধের চূড়ান্ত অধ্যায়টি এখনো অলিখিত। আর সেই অধ্যায়ের শিরোনাম হয়তো হবে—'পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের সমাধি এবং এক নতুন মধ্যপ্রাচ্যের জন্ম'।

মনে রাখবেন, ইতিহাসের চাকা যখন ঘোরে, তখন বড় বড় সাম্রাজ্য ধুলোয় মিশে যায়। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের এই দাবানল কি সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত? সময় এবং কেবল সময়ই এর উত্তর দেবে।