আনন্দ খবর ডেস্ক প্রকাশিত: ১৯ মে, ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম

বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ইসরায়েল এখন অপরাজেয়। গত কয়েক বছরে তারা একের পর এক সামরিক বিজয় অর্জন করেছে। হামাসকে কোণঠাসা করেছে। হিজবুল্লাহর শক্তি খর্ব করেছে। এমনকি তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু ইরানকেও তারা চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে—মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলই এখন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা।
কিন্তু, এই বিশাল সামরিক শক্তির আড়ালে কি এক বিশাল গর্ত তৈরি হচ্ছে? যে শক্তির ওপর ভিত্তি করে ইসরায়েল আজ বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, সেই শক্তির মূল উৎস কি শুকিয়ে যাচ্ছে?
রহস্যটা সামরিক ময়দানে নয়। রহস্যটা লুকিয়ে আছে ওয়াশিংটনের অন্দরে। যে আমেরিকা কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই আমেরিকার জনমত আজ নাটকীয়ভাবে বদলে যাচ্ছে।
আজ আমরা বিশ্লেষণ করব এক অপ্রিয় সত্য। কেন আমেরিকায় বাড়তে থাকা ইসরায়েল-বিরোধী মনোভাব এই ইহুদি রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি কোনো কাল্পনিক ভয় নয়, এটি একটি গাণিতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা।
পার্থিব শক্তির দম্ভ যখন আকাশে ওড়ে, তখন মাটির নিচের ফাটল অনেকেই দেখতে পায় না। ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে যদি আমরা পিউ রিসার্চ সেন্টারের (Pew Research) সাম্প্রতিক তথ্যের দিকে তাকাই, তবে শিউরে উঠতে হয়। আমেরিকার মতো প্রথাগত ইসরায়েল-বান্ধব দেশেও ৬০ শতাংশ মানুষ এখন ইসরায়েলের প্রতি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে।
ভাবুন একবার! যে দেশটি ইসরায়েলের জন্মলগ্ন থেকে তার ছায়া হয়ে ছিল, সেই দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখন ইহুদি রাষ্ট্রকে পছন্দ করছে না। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি যুগের অবসান।
আমেরিকার রাজনীতি দুই মেরুতে বিভক্ত। কিন্তু ইসরায়েল ইস্যুতে এতদিন দুই দলই এক ছিল। এখন আর নেই। ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতর এখন ইসরায়েল বিরোধী আগ্নেয়গিরি ফুটছে। দলের ৮০ শতাংশ সমর্থক এখন ইসরায়েলকে ঘৃণা করে।
নতুন প্রজন্মের প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটরা ইসরায়েলকে একটি 'দখলদার রাষ্ট্র' হিসেবে দেখে। তারা আর ইসরায়েলকে কোনো গণতান্ত্রিক মিত্র মনে করে না। জো বাইডেন ছিলেন শেষ 'পুরানো ধাঁচের' ডেমোক্র্যাট, যিনি ইসরায়েলকে মনেপ্রাণে সমর্থন করতেন। কিন্তু তার পরবর্তী নেতৃত্বে যারা আসছেন, তারা ইসরায়েলের নাম শুনলেই খড়গহস্ত হন।
অনেকে মনে করেন রিপাবলিকানরা তো ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক। ট্রাম্প তো ইসরায়েলের পরম বন্ধু। কিন্তু পর্দার আড়ালে চিত্রটা অন্যরকম। ১৮ থেকে ৪৯ বছর বয়সী রিপাবলিকানদের মধ্যে ৫৭ শতাংশই এখন ইসরায়েলের প্রতি বিমুখ।
ডানপন্থী ইনফ্লুয়েন্সাররা, যারা একসময় ইসরায়েলের গুণগান গাইতেন, তারা এখন অন্য সুরে কথা বলছেন। ক্যান্ডেস ওয়েন্সের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা এখন প্রকাশ্যেই ইসরায়েলের সমালোচনা করছেন। রিপাবলিকানদের মধ্যেও 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতি জোরালো হচ্ছে। তারা প্রশ্ন তুলছে—কেন আমাদের ট্যাক্সের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অন্য দেশের যুদ্ধে ব্যয় হবে?
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে কিছু গভীর মনস্তাত্ত্বিক কারণ।
প্রথমত, আমেরিকায় খ্রিস্টধর্মের প্রভাব কমছে। বিশেষ করে ইভানজেলিকাল খ্রিস্টানদের সংখ্যা কমছে, যারা ধর্মীয় কারণে ইসরায়েলকে সমর্থন করত।
দ্বিতীয়ত, হলোকাস্ট বা ইহুদি নিধনের সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখনকার প্রজন্মের কাছে নিছক ইতিহাস। ৮১ বছর আগের সেই ট্র্যাজেডি দিয়ে বর্তমানের সামরিক অভিযানকে জাস্টিফাই করা তরুণ প্রজন্মের কাছে কঠিন হয়ে পড়ছে।
আমেরিকা যদি ইসরায়েল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী এবং ধ্বংসাত্মক।
ইসরায়েলি ডিফেন্স ফোর্স বা আইডিএফ (IDF) কার্যত আমেরিকার অস্ত্রের ওপর টিকে আছে। প্রতি বছর আমেরিকা ইসরায়েলকে ৩.৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দেয়। যদি এই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তবে ইসরায়েলের অত্যাধুনিক আয়রন ডোম বা এফ-৩৫ ফাইটার জেটগুলো অকেজো হয়ে পড়বে। আমেরিকা বিমুখ হওয়া মানে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা দেওয়াল ধসে পড়া।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েল আজ পর্যন্ত যতবার পার পেয়ে গেছে, তার পেছনে ছিল আমেরিকার 'ভেটো' (Veto)। আমেরিকা যদি নিরপেক্ষ অবস্থান নেয় বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ভোট দেয়, তবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ইসরায়েলকে পঙ্গু করে দেবে। ইসরায়েল পরিণত হবে বিশ্বের এক অস্পৃশ্য রাষ্ট্রে।
আমেরিকা ইসরায়েলের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। হাই-টেক সেক্টরে মার্কিন বিনিয়োগ ইসরায়েলি অর্থনীতির মেরুদণ্ড। আমেরিকার জনমত যদি ইসরায়েলি পণ্য বর্জনের দিকে যায়, তবে তেল আবিবের আকাশচুম্বী অট্টালিকাগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
২০২৯ সালের জানুয়ারিতে যখন নতুন কোনো প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসে বসবেন, তখন পরিস্থিতি কী হবে? ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতর থেকে যদি কোনো কট্টর ইসরায়েল-বিরোধী নেতা ক্ষমতায় আসেন, তবে তিনি কি ইসরায়েলকে সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রের তকমা দেবেন? তিনি কি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে নিষিদ্ধ করবেন?
সম্ভাবনাগুলো এখন আর অবাস্তব নয়। ইসরায়েল সামরিকভাবে জিতছে ঠিকই, কিন্তু তারা আদর্শিক যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে। আমেরিকার জনমত এখন যেদিকে বইছে, তাতে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের কোনো বন্ধু খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে।
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো রাষ্ট্র কেবল অস্ত্র দিয়ে টিকে থাকতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন নৈতিক সমর্থন এবং শক্তিশালী মিত্র। ইসরায়েল তার সবচেয়ে বড় মিত্রকে হারাতে বসেছে। আর এই ফাটল যদি মেরামত করা না যায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই শক্তিশালী রাষ্ট্রটি হয়তো একদিন ইতিহাসের পাতায় কেবল একটি সামরিক অহংকারের গল্প হিসেবেই থেকে যাবে।