বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো, আর ছোট ছোট বালুকণা বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তোলে মহাদেশ সাগর অতল।" আপনারা কি জানেন, পেন্টাগনের জেনারেলরা কেন ইরানে সরাসরি হামলা করতে ভয় পান? কারণ মাটির শত শত ফুট নিচে ইরান তৈরি করে রেখেছে এমন এক 'মিসাইল সিটি' বা ক্ষেপণাস্ত্রের শহর, যা কোনো বাঙ্কার বাস্টার বোমা দিয়েও ধ্বংস করা সম্ভব নয়। আজ আমরা উন্মোচন করবো ইরানের সেই গোপন সামরিক শক্তি, যা দেখে খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। ইসরায়েলের তথাকথিত অপরাজেয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কি ইরানের বৃষ্টির মতো ধেয়ে আসা মিসাইল ঠেকাতে পারবে? চলুন জেনে নিই আসল সত্য।

ইরান আজ আর সেই আগের দেশ নেই যাকে কেবল নিষেধাজ্ঞার ভয় দেখিয়ে থামিয়ে রাখা যাবে। গত কয়েক দশকে দেশটি তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে এমন সব মারণাস্ত্র তৈরি করেছে যা বর্তমান বিশ্বের যেকোনো পরাশক্তির জন্য আতঙ্কের কারণ। বিশেষ করে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এখন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী ভাণ্ডার হিসেবে স্বীকৃত। পশ্চিমারা যতবারই বাধা দিতে চেয়েছে, ইরান ততবারই আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে।

ইরানের সামরিক শক্তির মূল স্তম্ভ হলো তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। তেহরানের হাতে এখন এমন সব মিসাইল আছে যা ২,০০০ কিলোমিটারের বেশি দূরে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এর মানে হলো, ইরান তার ভূমি থেকে বসেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলের প্রতিটি ইঞ্চি মাটির ওপর হামলা চালাতে পারে। এই সক্ষমতাই মূলত ওয়াশিংটনকে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে বাধা দিচ্ছে বারবার।

সবচেয়ে বড় চমক হলো ইরানের 'ফাত্তাহ' নামের হাইপারসনিক মিসাইল। শব্দের চেয়ে ১৫ গুণ বেশি দ্রুত গতিতে ছুটতে পারে এই দানবীয় অস্ত্র। বর্তমান বিশ্বের কোনো রাডার বা ডিফেন্স সিস্টেম এই মিসাইলকে মাঝ আকাশে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে না। যখন একটি ক্ষেপণাস্ত্র চোখের পলকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে, তখন প্রতিপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না।

ইরানের সামরিক কৌশল কেবল আকাশেই সীমাবদ্ধ নয়, মাটির নিচেও তারা গড়ে তুলেছে এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। স্যাটেলাইট ইমেজে দেখা গেছে, দেশটির পাহাড়ি অঞ্চলের গভীরে বিশাল বিশাল টানেল এবং ক্ষেপণাস্ত্র গুদাম রয়েছে। এগুলোকে বলা হয় 'মিসাইল সিটি'। এখান থেকে মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার রকেট ও মিসাইল উৎক্ষেপণ করা সম্ভব। মার্কিন গোয়েন্দারাও এই ভূগর্ভস্থ শহরগুলোর সঠিক হদিস বের করতে ব্যর্থ।

কেবল মিসাইল নয়, ড্রোনের জগতেও ইরান এখন এক অপ্রতিরোধ্য নাম। তাদের তৈরি 'শাহেদ' ড্রোনগুলো ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। অত্যন্ত কম খরচে তৈরি এই ড্রোনগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে যখন আক্রমণ করে, তখন বিশ্বের দামী দামী এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমগুলোও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এটি ইরানের এক অনন্য এবং সাশ্রয়ী সামরিক বুদ্ধিমত্তা।

ইসরায়েল সব সময় তাদের 'আয়রন ডোম' এবং 'অ্যারো' সিস্টেম নিয়ে বড়াই করে। কিন্তু ইরান যখন একসাথে শত শত ড্রোন এবং মিসাইল নিক্ষেপ করে, তখন এই সিস্টেমগুলো সম্পৃক্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ তারা সব আক্রমণ একসাথে ঠেকাতে পারে না। সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে দেখা গেছে যে, ইরানের বেশ কিছু মিসাইল সরাসরি ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে যা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে।

আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও ইরান এখন স্বাবলম্বী। তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি 'বাভার-৩৭৩' সিস্টেমকে রাশিয়ার এস-৪০০-এর চেয়েও উন্নত বলে দাবি করা হয়। এটি ৩০০ কিলোমিটার দূর থেকেই শত্রুর স্টিলথ যুদ্ধবিমান এবং ক্রুজ মিসাইল শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে। ফলে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের আকাশসীমায় ঢোকার আগে দশবার ভাববে, কারণ তারা জানে ফিরে আসাটা নিশ্চিত নয়।

ইরানের নৌবাহিনীও পারস্য উপসাগরে এক মূর্তমান আতঙ্ক। বড় বড় যুদ্ধজাহাজের পরিবর্তে তারা ব্যবহার করে শত শত দ্রুতগামী ছোট বোট বা 'স্পিডবোট'। এই বোটগুলো থেকে টর্পেডো এবং অ্যান্টি-শিপ মিসাইল ছোড়া হয়। সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন বিশালকার এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ারগুলো এই ছোট বোটগুলোর কাছে অত্যন্ত অসহায়। ইরান চাইলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিশ্ব তেলের বাজার বন্ধ করে দিতে পারে।

অনেকেই প্রশ্ন করেন, এত নিষেধাজ্ঞার মাঝে ইরান এই প্রযুক্তি পেল কোথায়? উত্তর হলো—দেশপ্রেম এবং আত্মনির্ভরশীলতা। ইরানের বিজ্ঞানীরা পশ্চিমা সাহায্যের অপেক্ষা না করে নিজেদের মেধা দিয়ে প্রতিটি পার্টস তৈরি করেছেন। তাদের এই অগ্রগতি প্রমাণ করে যে, কোনো জাতিকে দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয় যদি তাদের লক্ষ্য স্থির থাকে। আজ ইরান কেবল একটি দেশ নয়, একটি সামরিক আদর্শের নাম।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে রণহুঙ্কার দেন, তখন তাকে মনে রাখতে হবে যে তিনি কোনো দুর্বল রাষ্ট্রের সাথে কথা বলছেন না। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বা আইআরজিসি (IRGC) সরাসরি খামেনির প্রতি অনুগত এবং তারা জীবন দিতে প্রস্তুত। এই আত্মত্যাগী মনোভাব এবং উন্নত প্রযুক্তির সংমিশ্রণ ইরানকে একটি ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ করে তুলেছে যা আমেরিকা ও ইসরায়েলের জন্য দুঃস্বপ্ন।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়েও পশ্চিমাদের মনে কাঁপন ধরেছে। যদিও ইরান বারবার বলেছে তারা পারমাণবিক বোমা চায় না, কিন্তু তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা বলছে অন্য কথা। যদি কোনোভাবে ইরান পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করে ফেলে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের পুরো সমীকরণ চিরতরে বদলে যাবে। তখন ইসরায়েলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা হবে এক অসম্ভব চ্যালেঞ্জ যা ট্রাম্পকে বিচলিত করে তুলছে।

ট্রাম্পের উপদেষ্টারা তাকে বারবার সতর্ক করছেন যে, ইরানে হামলা করা মানে হলো 'মৌমাছির চাকে ঢিল মারা'। কারণ ইরান একা যুদ্ধ করবে না; লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের মিলিশিয়ারা একসাথে ইসরায়েল ও মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানবে। এই চারমুখী আক্রমণ সামলানোর ক্ষমতা আমেরিকার নেই। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকার বিদায় ঘণ্টা বেজে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সামরিক শক্তির পাশাপাশি ইরানের রয়েছে বিশাল এক মানবসম্পদ। দেশটির সেনাবাহিনী এবং রিজার্ভ ফোর্সের সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন। মার্কিন সৈন্যরা যেখানে প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল, ইরানি সৈন্যরা সেখানে আদর্শিক লড়াইয়ে বিশ্বাসী। একটি অসম যুদ্ধে যখন প্রযুক্তি ব্যর্থ হয়, তখন এই মানবশক্তিই জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে দেয়। ভিয়েতনাম বা আফগানিস্তানের চেয়েও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হবে আমেরিকার জন্য।

ইরানের ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার বা সাইবার সক্ষমতাও কোনো অংশে কম নয়। তারা এর আগে মার্কিন অত্যাধুনিক আরকিউ-১৭০ সেন্টিনেল ড্রোনকে কোনো গুলি না চালিয়েই হ্যাক করে অক্ষত অবস্থায় মাটিতে নামিয়ে এনেছিল। এই ঘটনা পুরো বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে ইরান সাইবার জগতেও কতটা শক্তিশালী। মার্কিন ড্রোনগুলো এখন ইরানের আকাশে উড়তে ভয় পায় পাছে তারা আবার হ্যাক হয়।

পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো সব সময় ইরানকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরে। কিন্তু সত্য হলো, ইরান একটি প্রাচীন সভ্যতা এবং তাদের সামরিক কৌশল অত্যন্ত গভীর। তারা জানে কখন ধৈর্য ধরতে হয় এবং কখন আঘাত করতে হয়। তাদের এই 'স্ট্র্যাটেজিক পেশেন্স' বা কৌশলগত ধৈর্য আমেরিকাকে ক্লান্ত করে দিচ্ছে। ট্রাম্পের মতো অস্থির প্রকৃতির নেতার জন্য ইরান এক গোলকধাঁধা যার সমাধান তার কাছে নেই।

ইরানের অর্থনীতি নিয়ে অনেক নেতিবাচক কথা বলা হলেও তাদের সামরিক বাজেট কিন্তু কমছে না। বরং তারা প্রতিটি পয়সার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করছে। আজ ইরান তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে, যা তাদের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াচ্ছে। সৌদি আরব বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোও এখন ইরানের সাথে সুসম্পর্ক গড়তে আগ্রহী হচ্ছে কেবল তাদের শক্তির কথা বিবেচনা করে।

ভবিষ্যতের যুদ্ধ হবে ড্রোন এবং মিসাইলের। আর এই দুই ক্ষেত্রেই ইরান এখন বিশ্বসেরাদের কাতারে। ট্রাম্প যদি মনে করেন কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বা হুমকি দিয়ে ইরানকে নতজানু করবেন, তবে তিনি ভুল করছেন। ইরান এখন এক আত্মবিশ্বাসী শক্তি যারা যেকোনো চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। মার্কিন দম্ভের বিপরীতে ইরানের এই উত্থান বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে যা অদম্য।

শেষে, ইরানের সামরিক শক্তি কেবল যুদ্ধের জন্য নয়, বরং এটি তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি ঢাল। যারা অন্যের ওপর আগ্রাসন চালাতে চায়, তাদের জন্য ইরান এক কঠিন শিক্ষা। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার মিত্রদের উচিত হবে সংঘাতের পথ পরিহার করে আলোচনার টেবিলে আসা। অন্যথায়, ইরানের আগুনের লেলিহান শিখায় তাদের সাম্রাজ্য পুড়ে ছাই হয়ে যেতে পারে।

দর্শক, আপনি কি মনে করেন ইরানের এই অবিশ্বাস্য সামরিক শক্তির সামনে আমেরিকা কি পিছু হটতে বাধ্য হবে? নাকি মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ? আপনার মূল্যবান কমেন্ট আমাদের জানান।

news