পর্বতের মূষিক প্রসব নয়, বরং সাগরের নিচে আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ। যে গভীরতা সম্পর্কে জানে না, তার সেই অতল গহ্বরে নামা সাজে না। কল্পনা করুন মাটির ৫০০ ফুট নিচে এক বিশাল শহর, যেখানে কোনো মানুষ নয় বরং বাস করে হাজার হাজার দানবীয় মিসাইল! যেখানে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত টানেলের ভেতর দিয়ে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। এটি কোনো সায়েন্স ফিকশন মুভি নয়, বরং ইরানের সেই রহস্যময় 'মিসাইল সিটি' যা পেন্টাগনের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। কেন এই শহরগুলোতে আমেরিকা হামলা করার সাহস পায় না? আজ আমরা প্রবেশ করবো ইরানের সেই গোপন মাটির তলার সাম্রাজ্যে।

ইরানের সামরিক কৌশলের সবচেয়ে রহস্যময় এবং শক্তিশালী দিক হলো তাদের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র শহর বা 'মিসাইল সিটি'। এটি মূলত পাহাড়ের নিচে বা মরুভূমির গভীর স্তরে তৈরি এক বিশাল টানেল নেটওয়ার্ক। ইরান সরকার যখন প্রথম এই শহরের ভিডিও প্রকাশ করে, তখন পশ্চিমা বিশ্ব হতবাক হয়ে গিয়েছিল। কারণ তারা কল্পনাও করতে পারেনি যে কোনো দেশ মাটির নিচে এত বড় সামরিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে।

এই শহরগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে পৃথিবীর শক্তিশালী কোনো বাঙ্কার বাস্টার বোমা বা পরমাণু বোমাও এর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। প্রতিটি টানেল কয়েক স্তর বিশিষ্ট কংক্রিট এবং স্টিলের আবরণে সুরক্ষিত। ইরানের দাবি অনুযায়ী, তাদের এই মিসাইল সিটিগুলো সারা দেশে ছড়িয়ে আছে এবং প্রতিটি প্রদেশেই অন্তত একটি করে এমন গোপন ঘাঁটি রয়েছে যা যে কোনো যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম।

ইরানি জেনারেলদের মতে, এই ভূগর্ভস্থ শহরগুলো থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে শত শত ব্যালিস্টিক মিসাইল উৎক্ষেপণ করা সম্ভব। পাহাড়ের গায়ে তৈরি বিশেষ সব ছিদ্র বা সাইলো দিয়ে মিসাইলগুলো বের হয়ে আসে এবং লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে যায়। শত্রুপক্ষ রাডারে কিছু দেখার আগেই তাদের ওপর বৃষ্টির মতো ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এটি মূলত এক প্রকার অদৃশ্য আক্রমণ যা রুখে দেওয়া অসম্ভব।

মিসাইল সিটির ভেতরে রয়েছে আধুনিক পরিবহণ ব্যবস্থা। বিশাল বিশাল মিসাইলগুলো স্বয়ংক্রিয় যানের মাধ্যমে এক টানেল থেকে অন্য টানেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এই শহরগুলো কেবল মিসাইল রাখার জায়গা নয়, বরং এখানে রয়েছে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় মিসাইল তৈরির কারখানা। অর্থাৎ যুদ্ধের সময় বাইরের সব কারখানা ধ্বংস হয়ে গেলেও মাটির নিচেই নিরবচ্ছিন্নভাবে মারণাস্ত্র তৈরি করতে পারবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।

আমেরিকার সিআইএ এবং ইসরায়েলের মোসাদ বছরের পর বছর চেষ্টা করেও এই গোপন শহরগুলোর সঠিক অবস্থান বের করতে পারেনি। প্রতিটি টানেলের প্রবেশপথ এমনভাবে ছদ্মবেশে তৈরি করা হয়েছে যে ওপর থেকে ড্রোন দিয়েও তা শনাক্ত করা যায় না। এই অনিশ্চয়তাই ট্রাম্প প্রশাসনকে এক গভীর আতঙ্কে রেখেছে। তারা জানে যে কোনো আক্রমণ শুরু করলে ইরানের এই অদৃশ্য দুর্গ থেকে পাল্টা জবাব আসবেই।

ইরানের এই ভূগর্ভস্থ সাম্রাজ্যে কর্মরত সৈন্যরা সম্পূর্ণ আলাদা এক পরিবেশে প্রশিক্ষণ পায়। তারা মাসের পর মাস সূর্যের আলো ছাড়াই মাটির নিচে থাকতে অভ্যস্ত। এই শহরগুলোতে রয়েছে নিজস্ব বিদ্যুৎ কেন্দ্র, হাসপাতাল এবং পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত ব্যবস্থা। অর্থাৎ ইরান যদি কোনো বিশাল অবরোধের মুখেও পড়ে, তাদের এই সামরিক শক্তি অন্তত এক বছর সচল থাকবে কোনো বাইরের সাহায্য ছাড়াই।

মিসাইল সিটির ভিডিওতে দেখা গেছে, দেওয়ালে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে 'ইমাদ', 'শাহাব' এবং 'কিয়াম' এর মতো শক্তিশালী সব ব্যালিস্টিক মিসাইল। এর মধ্যে অনেকগুলো পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম। যদিও ইরান বলে আসছে তারা শান্তি চায়, কিন্তু তাদের এই প্রস্তুতি বলছে তারা যে কোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর। এই অদম্য মনোভাবই মূলত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ।

ইসরায়েলের জন্য এই মিসাইল সিটিগুলো এক মূর্তিমান আতঙ্ক। তেল আবিব জানে যে ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরু হলে তাদের আয়রন ডোম এই ভূগর্ভস্থ সাইলো থেকে আসা মিসাইলের চাপ সহ্য করতে পারবে না। একসাথে হাজার হাজার মিসাইল যখন মাটির নিচ থেকে আকাশের দিকে উঠে আসবে, তখন ইসরায়েলের পুরো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধসে পড়বে। এটি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র যা পুরো বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলছে।

ট্রাম্পের সময়কালীন নীতিগুলো ইরানকে আরও বেশি আত্মনির্ভরশীল করে তুলেছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান এখন নিজেই নিজের সব পার্টস তৈরি করছে। মিসাইল সিটির প্রতিটি মিসাইলই 'মেড ইন ইরান'। এতে করে পশ্চিমাদের সাপ্লাই চেইন বন্ধ করার কৌশল আর কাজ করছে না। ইরানের এই প্রযুক্তিগত সাফল্য আজ সারা বিশ্বের নির্যাতিত দেশগুলোর জন্য এক নতুন প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের এই ভূগর্ভস্থ দুর্গগুলো মূলত তাদের 'সেকেন্ড স্ট্রাইক' সক্ষমতার অংশ। অর্থাৎ যদি আমেরিকা ইরানের ওপর বড় কোনো বিমান হামলা চালায় এবং ওপরের সব স্থাপনা ধ্বংসও করে দেয়, তবুও মাটির নিচের এই শহরগুলো থেকে ইরান পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে আমেরিকাকে ধ্বংস করে দিতে পারবে। এই কারণেই ইরানকে বলা হয় 'অপ্রতিরোধ্য সামরিক পরাশক্তি' যা মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে।

ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের কর্মকর্তারা গর্ব করে বলেন যে, তাদের হাতে এত পরিমাণ মিসাইল আছে যে রাখার জায়গা হচ্ছে না। আর এই কারণেই তারা নিয়মিত নতুন নতুন মিসাইল সিটি তৈরি করে যাচ্ছে। প্রতিটি নতুন ঘাঁটি আগের চেয়ে আরও আধুনিক এবং দুর্ভেদ্য। এই প্রতিযোগিতায় আমেরিকা ও ইসরায়েল প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছে, কারণ তারা মাটির নিচের এই যুদ্ধের জন্য একদমই প্রস্তুত নয়।

ইরানের ইলেকট্রনিক জ্যামিং ব্যবস্থাও এই টানেলগুলোর ভেতর সক্রিয়। এর মানে হলো শত্রু যদি কোনোভাবে কোনো মিসাইল সাইলো খুঁজেও পায়, তবে তাদের জিপিএস বা সিগন্যাল সেখানে কাজ করবে না। ফলে নিখুঁতভাবে আঘাত হানা সম্ভব হবে না। এই প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ইরানকে দিয়েছে এক অন্যরকম উচ্চতা। ট্রাম্পের আস্ফালন কেবল টিভিতেই সীমাবদ্ধ, যুদ্ধের ময়দানে ইরানই এখন আসল রাজা।

আপনারা শুনলে অবাক হবেন যে, এই টানেলগুলোর দৈর্ঘ্য কয়েকশ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। যা এক শহর থেকে অন্য শহরের সাথে মাটির নিচ দিয়েই যুক্ত। ইরান চাইলে এক শহর থেকে মিসাইল পাঠিয়ে অন্য শহরের সাইলো দিয়ে তা উৎক্ষেপণ করতে পারে। এই গতিশীলতা শত্রুকে বিভ্রান্ত করার জন্য যথেষ্ট। এমন সামরিক বুদ্ধিমত্তা বর্তমানে বিশ্বের খুব কম দেশের কাছেই সংরক্ষিত রয়েছে।

২০২৪ সালে এসে ইরান এখন তাদের ড্রোন বাহিনীকেও এই ভূগর্ভস্থ শহরগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এখন মাটির নিচ থেকেই ড্রোন উড়ে গিয়ে শত্রুর ঘাঁটিতে হামলা চালাতে পারে। অর্থাৎ ওপর থেকে দেখার কোনো উপায় নেই যে আক্রমণটি আসলে কোথা থেকে শুরু হয়েছে। ইরানের এই বহুমুখী আক্রমণ ক্ষমতা আমেরিকাকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরানের জনগণকে এই মিসাইল সিটিগুলো এক বিশাল আত্মবিশ্বাস যোগায়। তারা জানে যে তাদের দেশ সুরক্ষিত। পশ্চিমাদের অপপ্রচার এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাঝেও ইরানের এই বীরত্ব তাদের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রেখেছে। আমেরিকা যতবারই ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দেয়, ইরান ততবারই তাদের নতুন কোনো মিসাইল সিটির ভিডিও প্রকাশ করে ট্রাম্পের মুখের ওপর উপযুক্ত জবাব দিয়ে দেয়।

যুদ্ধ কখনোই ভালো নয়, কিন্তু যখন পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যায় তখন ইরান যে মূর্তিমূর্তি ধারণ করবে তা ভাবলে শিউরে উঠতে হয়। ইরানের এই প্রস্তুতি কোনো দেশকে আক্রমণ করার জন্য নয়, বরং নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য। কিন্তু ট্রাম্প ও তার মিত্ররা যদি ভুল করে তবে এই মাটির তলার দানবগুলো জেগে উঠবে এবং তখন রক্ষা পাওয়ার কোনো পথ থাকবে না যা ধ্রুব সত্য।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, ইরানের মিসাইল সিটি কেবল কংক্রিটের কাঠামো নয়, এটি তাদের স্বাধীনতার প্রতীক। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সামনে মাথা নত না করার এক জলজ্যন্ত উদাহরণ। আমেরিকা ও ইসরায়েলকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি শান্তির পথে আসবে নাকি ইরানের এই ভূগর্ভস্থ আগ্নেয়গিরির মুখে নিজেদের অস্তিত্ব বিসর্জন দেবে। ইতিহাস কিন্তু ইরানের সাহসের পক্ষেই কথা বলছে।

দর্শক, ইরানের এই অজেয় ভূগর্ভস্থ মিসাইল সিটি নিয়ে আপনার ভাবনা কী? আমেরিকা কি সত্যিই পারবে এই দুর্ভেদ্য দুর্গ ভেদ করতে? আপনার মন্তব্য নিচে লিখুন।

news