যে আগুন অন্যের ঘরে লাগাতে যায়, তার নিজের ঘরই আগে পুড়ে ছাই হয়। আজকের ঘটনাপ্রবাহ যেন সেই প্রবাদকেই সত্যি করে তুলছে। মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধের দামামা বাজছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ সালের ইরাক আগ্রাসনের পর সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ গড়ে তুলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই শক্তি প্রদর্শন কি সত্যিই ইরানকে ভয় দেখাতে পারবে?
২০০৩ সালে ইরাকে হামলার পর যেভাবে মার্কিন সামরিক শক্তি গোটা অঞ্চল কাঁপিয়ে দিয়েছিল, ঠিক তেমন এক দৃশ্য আবারও তৈরি হচ্ছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধ এখন চরম পর্যায়ে। আকাশপথে স্টিলথ যুদ্ধবিমান, সমুদ্রে রণতরী—সব মিলিয়ে এক অস্থির পরিস্থিতি। কিন্তু এবার মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ আগের মতো নেই।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অত্যাধুনিক এফ-৩৫ লাইটনিং এবং এফ-২২ র্যাপ্টর স্টিলথ ফাইটার ইতিমধ্যেই জর্ডান ও সৌদি আরবের ঘাঁটিতে অবস্থান নিয়েছে। এই যুদ্ধবিমানগুলো যেকোনো মুহূর্তে হামলার প্রস্তুতিতে রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে এই বিশাল বাহিনী। প্রশ্ন হচ্ছে, ট্রাম্প কি শেষ পর্যন্ত বোতাম টিপবেন?
শুধু আকাশ নয়, সমুদ্রপথেও শক্ত অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পারস্য উপসাগর ও ভূমধ্যসাগরে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ তেরটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। আরও একটি শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড তার স্ট্রাইক গ্রুপ নিয়ে এগিয়ে আসছে। এই উপস্থিতি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—ওয়াশিংটন পিছু হটছে না।
তবে সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কোনো একক হামলার প্রস্তুতি নয়। বরং কয়েক সপ্তাহব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী বিমান যুদ্ধের সক্ষমতা গড়ে তোলা হচ্ছে। অর্থাৎ লক্ষ্য শুধু প্রতীকী আঘাত নয়, বরং ইরানের অবকাঠামোতে গভীর ক্ষত তৈরি করা। কিন্তু ইরান কি এত সহজে ভেঙে পড়বে?
হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি হামলার পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি বিবেচনা করছেন। মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। হামলার লক্ষ্য শুধু পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা থাকবে, নাকি শাসনব্যবস্থা বদলের চেষ্টা হবে—এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি।
এদিকে জেনেভায় পরোক্ষ আলোচনার খবরও পাওয়া গেছে। দুই পক্ষই আলোচনায় বসলেও মৌলিক অবস্থান থেকে কেউ সরে আসেনি। ইরান তার সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আপস করবে না বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় কঠোর শর্তে নতুন চুক্তি। এই টানাপোড়েনই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পাল্টা প্রস্তুতিতে ইরানও বসে নেই। তেহরান তার বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার প্রস্তুত রেখেছে। আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি বাহিনীগুলোকেও সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। ইরানের বার্তা স্পষ্ট—হামলা হলে জবাব হবে কঠোর ও ব্যাপক। এই আত্মবিশ্বাস মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।
সবচেয়ে বড় হুঁশিয়ারি এসেছে হরমুজ প্রণালী নিয়ে। ইরান ঘোষণা দিয়েছে, হামলা হলে তারা বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই জলপথ বন্ধ করে দিতে পারে। প্রতিদিন বিশ্ব তেলের বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। হরমুজ বন্ধ মানেই বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ভয়াবহ ঝড়।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই শক্তি প্রদর্শনের মূল লক্ষ্য হতে পারে ইরানকে একটি কঠিন চুক্তিতে বাধ্য করা। কিন্তু ইতিহাস বলছে, ইরান কখনো চাপের কাছে নত হয়নি। বরং প্রতিবারই তারা আরও শক্ত অবস্থান নিয়েছে। তাই এই কৌশল উল্টো ফলও দিতে পারে।
ট্রাম্প সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান চুক্তি না করার পরিণতি ভোগ করতে প্রস্তুত নয়। এই বক্তব্যে স্পষ্ট হুমকির সুর। কিন্তু একইসঙ্গে প্রশ্ন জাগে—দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই কতটা প্রস্তুত? মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধ কি আমেরিকার জন্য আরেকটি অচলাবস্থা তৈরি করবে না?
ইসরায়েলও এই সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তেহরান ও তেলআবিবের দীর্ঘদিনের বৈরিতা এখন আরও তীব্র। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোট যদি সরাসরি সংঘাতে জড়ায়, তাহলে পুরো অঞ্চল জ্বলে উঠতে পারে। লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন—সব জায়গায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের সামরিক সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক উন্নত। নিজস্ব ড্রোন প্রযুক্তি, নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক প্রভাব—সব মিলিয়ে তারা এখন মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী খেলোয়াড়। তাই ২০০৩ সালের ইরাকের সঙ্গে বর্তমান ইরানের তুলনা করা বড় ভুল হবে। এই বাস্তবতা বুঝতেই হবে ওয়াশিংটনকে।
মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষ নতুন যুদ্ধ চায় না। তারা চায় স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন। কিন্তু বড় শক্তিগুলোর ক্ষমতার খেলায় সাধারণ মানুষের স্বপ্ন বারবার ভেঙে যায়। যদি সংঘাত শুরু হয়, তার মূল্য দেবে পুরো অঞ্চল এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি।
শেষে প্রশ্ন একটাই—এই বিশাল সামরিক সমাবেশ কি সত্যিই শান্তি আনবে, নাকি আরও বড় অগ্নিসংযোগের সূচনা করবে? ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, তারা ভয় পায় না। যুক্তরাষ্ট্রও পিছু হটার ইঙ্গিত দেয়নি। তাই আগামী দিনগুলো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
দর্শক, পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। শক্তির প্রদর্শন যত বাড়ছে, ততই উত্তেজনা বাড়ছে। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা বলছে, আগ্রাসন কখনো স্থায়ী সমাধান দেয় না। ইরানের দৃঢ় অবস্থান এবং আঞ্চলিক সমর্থন হয়তো এই সংঘাতের গতিপথ বদলে দিতে পারে।
আপনারা কী মনে করেন? এই শক্তির লড়াই কোথায় গিয়ে থামবে? হরমুজ কি সত্যিই বন্ধ হবে? নাকি শেষ মুহূর্তে কূটনৈতিক সমাধান আসবে? মতামত জানাতে কমেন্ট করুন।
