বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো, আর বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা। যার হাতে থাকে তলোয়ার, সেই পায় আসল অধিকার।" আপনারা কি জানেন, মাত্র ৪ মিনিট! হ্যাঁ, ইরান থেকে ইসরায়েলে আঘাত হানতে ইরানের নতুন 'ফাত্তাহ' মিসাইলের সময় লাগবে মাত্র ৪ মিনিট। এই সময়ের মধ্যে ইসরায়েলের কোনো ডিফেন্স সিস্টেম সক্রিয় হওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে যাবে। আমেরিকা ও ইসরায়েল যা কল্পনাও করতে পারেনি, ইরান তা বাস্তবে করে দেখিয়েছে। আজ আমরা কথা বলবো ইরানের সেই অজেয় হাইপারসনিক মিসাইল নিয়ে, যা বর্তমান বিশ্বের যেকোনো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

ইরানের সামরিক ইতিহাসে 'ফাত্তাহ' একটি বিপ্লবের নাম। যখন আমেরিকা ও তার মিত্ররা মনে করছিল নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরান পিষ্ট হচ্ছে, ঠিক তখনই তেহরান উন্মোচন করল তাদের প্রথম হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল। 'ফাত্তাহ' মানে হলো 'বিজয়ী'। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি শব্দের চেয়ে ১৩ থেকে ১৫ গুণ বেশি দ্রুত গতিতে ছুটতে পারে। এই অবিশ্বাস্য গতিই একে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্রের তালিকায় শীর্ষে নিয়ে এসেছে।

হাইপারসনিক মিসাইল সাধারণ ব্যালিস্টিক মিসাইলের মতো নয়। এটি কেবল দ্রুত গতির নয়, বরং এটি বায়ুমণ্ডলের ভেতরে এবং বাইরে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। এর মানে হলো, কোনো কম্পিউটার বা রাডার আগে থেকে অনুমান করতে পারবে না এটি ঠিক কোথায় আঘাত হানবে। ইরানের এই প্রযুক্তি বিশ্ববাসীকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তির ভারসাম্য এখন সম্পূর্ণভাবে তেহরানের পক্ষে চলে গেছে।

ইসরায়েলের 'আয়রন ডোম' বা আমেরিকার 'প্যাট্রিয়ট' মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমগুলো মূলত ধীরগতির বা নির্দিষ্ট পথে চলা মিসাইল ঠেকানোর জন্য তৈরি। কিন্তু ফাত্তাহর মতো হাইপারসনিক মিসাইল যখন এঁকেবেঁকে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসে, তখন এই সিস্টেমগুলো অন্ধ হয়ে যায়। পেন্টাগনের গোপন নথিতে স্বীকার করা হয়েছে যে, বর্তমানে এমন কোনো প্রযুক্তি নেই যা ইরানের এই ফাত্তাহ মিসাইলকে রুখতে পারে।

ফাত্তাহ মিসাইলটির রেঞ্জ বা পাল্লা ১,৪০০ কিলোমিটার। এর মানে হলো, ইরান তার নিজ ভূমি থেকেই পুরো ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত প্রতিটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নিখুঁতভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন যুদ্ধের হুমকি দেন, তখন তাকে এই মিসাইলের কথা মাথায় রাখতে হচ্ছে। কারণ একটি ফাত্তাহ মিসাইলই যথেষ্ট আমেরিকার কোনো বিশাল বিমানবাহী রণতরীকে সাগরের নিচে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যখন এই মিসাইলটি বিশ্বের সামনে আনলেন, তখন ওয়াশিংটনে রীতিমতো কম্পন শুরু হয়েছিল। ইরান প্রমাণ করেছে যে, পশ্চিমা সাহায্য ছাড়াই তারা বিশ্বের সবচেয়ে জটিল প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে পারে। এটি কেবল একটি অস্ত্র নয়, এটি ইরানের বিজ্ঞানীদের মেধা এবং সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধের এক বিশাল বিজয় যা ট্রাম্পকে বারবার ভাবিয়ে তুলছে।

ফাত্তাহর ইঞ্জিনে ব্যবহৃত হয়েছে সলিড ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানি, যা একে মুহূর্তের মধ্যে উৎক্ষেপণের উপযোগী করে তোলে। সাধারণ মিসাইল ছোড়ার আগে অনেক সময় লাগে, কিন্তু ফাত্তাহ সাইলো থেকে বের হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার সর্বোচ্চ গতি অর্জন করে। এই ক্ষিপ্রতাই ইরানকে যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে রেখেছে। ইরানের এই অগ্রগতি আজ পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য এক গর্বের বিষয়।

পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ইরানের এই সক্ষমতাকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করলেও রাশিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞরা ফাত্তাহর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তারা বলছেন, ইরানের এই প্রযুক্তি রাশিয়া বা চীনের হাইপারসনিক প্রযুক্তির সাথে পাল্লা দেওয়ার মতো। ইরানের এই কৌশলগত জয় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতি এখন ইরানের 'ফাত্তাহ'র কাছে অসহায়।

ফাত্তাহ মিসাইলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর 'ম্যানুভারেবল রি-এন্ট্রি ভেহিকল' বা মার্ভ (MaRV)। এটি যখন বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশ করে, তখন এটি অসম্ভব দ্রুত গতিতে দিক পরিবর্তন করে। এতে করে শত্রুপক্ষের অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ইরান এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করার মাধ্যমে নিজেকে বিশ্বের সেই গুটি কয়েক দেশের তালিকায় নিয়ে গেছে যাদের কাছে হাইপারসনিক অস্ত্র রয়েছে।

ইসরায়েল সব সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করে থাকে। কিন্তু ফাত্তাহর উপস্থিতির পর তারা এখন সেই চিন্তা বাদ দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার কথা ভাবছে। তেল আবিব জানে, যদি তারা ইরানের ওপর একটিও ড্রোন চালায়, তবে প্রতিউত্তরে শত শত ফাত্তাহ মিসাইল তাদের শহরগুলোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে। ইরানের এই 'ডিটারেন্স' বা প্রতিরোধ ক্ষমতা এখন ইসরায়েলের বড় মাথাব্যথা।

ট্রাম্পের শাসনামলে ইরানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ চাপ বা 'ম্যাক্সিমাম প্রেসার' পলিসি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফলাফল হয়েছে উল্টো। ইরান এখন সামরিকভাবে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বাবলম্বী। ফাত্তাহ মিসাইলটি ইরানের সেই জেদের বহিঃপ্রকাশ। নিষেধাজ্ঞা যে ইরানকে দমাতে পারেনি, বরং আরও সৃজনশীল এবং শক্তিশালী করে তুলেছে, ফাত্তাহ হলো তার জীবন্ত প্রমাণ যা মার্কিন নীতিনির্ধারকদের পরাজয় নিশ্চিত করেছে।

ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের দাবি, ফাত্তাহ মিসাইলটি কেবল শুরু। তারা ইতিমধ্যে ফাত্তাহ-২ এর কাজ শুরু করেছে যার পাল্লা এবং গতি হবে আরও বেশি। ইরানের এই সামরিক ঊর্ধ্বগতি প্রমাণ করে যে, তারা ভবিষ্যতে কোনো পরাশক্তির রক্তচক্ষু সহ্য করবে না। যারা ইরানকে হুমকি দিতে চায়, তাদের মনে রাখতে হবে—তেহরানের হাতে এখন এমন তলোয়ার আছে যা দিয়ে তারা নিমেষেই শত্রুর গর্দান নিতে পারে।

হাইপারসনিক প্রযুক্তি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জটিল। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ এখনো এই প্রযুক্তিতে সফল হতে পারেনি। অথচ ইরান সম্পূর্ণ দেশীয় যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে এটি তৈরি করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ থাকলে যেকোনো অসাধ্য সাধন করা সম্ভব। ইরানের এই সাফল্য আজ বিশ্বের নিপীড়িত দেশগুলোর জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।

পেন্টাগনের গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইরানের ফাত্তাহ মিসাইল আমেরিকার গ্লোবাল ডিফেন্স নেটওয়ার্ককে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। যদি যুদ্ধ শুরু হয়, তবে আমেরিকা হয়তো তার ঘাঁটিগুলো রক্ষা করতে পারবে না। ট্রাম্পের দম্ভ আর আস্ফালন কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, কারণ যুদ্ধের ময়দানে প্রযুক্তি আর সাহসের লড়াইয়ে ইরান এখন অপ্রতিরোধ্য। ফাত্তাহ হলো ইরানের সেই অজেয় ঢাল ও তলোয়ার।

আপনারা শুনলে অবাক হবেন যে, ফাত্তাহ মিসাইলটি রাডার সিগনেচার অত্যন্ত কম। এর মানে হলো এটি রাডারে ধরা দেওয়া অনেক কঠিন। এটি যখন লক্ষ্যবস্তুর দিকে যায়, তখন এটি আগুনের গোলার মতো দেখায় এবং এর গতিবেগ এত বেশি যে কোনো মানুষ চোখের পলক ফেলার আগেই সেটি আঘাত হানে। এই বিধ্বংসী ক্ষমতাই ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের আসল শক্তিকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

অনেকেই প্রশ্ন করেন, ইরান কেন এত অস্ত্র তৈরি করছে? উত্তর হলো আত্মরক্ষা। যে অঞ্চলে প্রতি মুহূর্তে যুদ্ধের ষড়যন্ত্র চলছে, সেখানে শক্তিশালী হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। ইরান আজ শক্তিশালী বলেই ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার পিছিয়ে যাচ্ছেন। ফাত্তাহ মিসাইল হলো শান্তির গ্যারান্টি, কারণ এটি শত্রুকে আক্রমণ করার চিন্তা থেকে বিরত রাখে। শক্তির ভারসাম্যই হলো শান্তির মূল চাবিকাঠি।

ভবিষ্যতে যদি মধ্যপ্রাচ্যে কোনো সংঘাত বাধে, তবে ফাত্তাহ মিসাইল হবে সেই গেম-চেঞ্জার যা আমেরিকার দম্ভ চূর্ণ করে দেবে। ইসরায়েল ও আমেরিকার জোট যতই ফন্দি আঁটুক না কেন, ইরানের এই হাইপারসনিক তলোয়ার তাদের সব পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। ইরানের এই সামরিক বিপ্লব ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে যা অদম্য তেহরানের বীরত্বগাঁথা হিসেবে পরিচিত হবে।

শেষে বলা যায়, ফাত্তাহ মিসাইল কেবল একটি অস্ত্র নয়, এটি ইরানের জনগণের আত্মমর্যাদা। যারা ইরানকে বারবার ধ্বংস করতে চেয়েছে, ফাত্তাহ তাদের জন্য এক চরম হুঁশিয়ারি। ট্রাম্প এবং তার মিত্ররা যদি এখনো না বুঝে থাকে, তবে সময় বলে দেবে ইরানের এই বিজয় যাত্রা কোথায় গিয়ে থামে। অজেয় ইরান আর তার ফাত্তাহ মিসাইল আজ বিশ্ব রাজনীতির নতুন মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।

দর্শক, আপনি কি মনে করেন ইরানের এই 'ফাত্তাহ' মিসাইল কি সত্যিই আমেরিকার দম্ভ চূর্ণ করতে পারবে? আপনার মূল্যবান মতামত কমেন্ট করে জানান।

news