বনের বাঘ মরে গেলেও তার নখ রয়ে যায়, আর বীরের মৃত্যু হলেও তার আদর্শ লক্ষ কোটি সৈন্য তৈরি করে। যিনি একাই ছিলেন একটি আস্ত সেনাবাহিনীর সমান! যাকে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পেন্টাগন মনে করত তাদের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন। তিনি আর কেউ নন, ইরানের কিংবদন্তি জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার তৈরি করা 'কুদ্স ফোর্স' আজ পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকাকে হটিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। কীভাবে একজন সাধারণ মানুষ হয়েও তিনি হয়ে উঠলেন বিশ্ব রাজনীতির 'শ্যাডো কমান্ডার'? আজ আমরা উন্মোচন করবো সোলাইমানির সেই গোপন রণকৌশল যা ইসরায়েল এবং আমেরিকাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
জেনারেল কাসেম সোলাইমানি কেবল একজন সেনাপতি ছিলেন না, তিনি ছিলেন ইরানের প্রতিরোধের প্রতীক। তার নেতৃত্বে গঠিত 'কুদ্স ফোর্স' আজ বিশ্বের অন্যতম সেরা স্পেশাল ফোর্স হিসেবে স্বীকৃত। এই বাহিনীর মূল লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ দূর করা এবং ফিলিস্তিনকে মুক্ত করা। সোলাইমানি তার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক এবং ইয়েমেনে এমন এক প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন যা আমেরিকার আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রকেও হার মানিয়েছে।
সোলাইমানির রণকৌশলের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল 'অপ্রতিসম যুদ্ধ' বা অ্যাসিম্যাট্রিক ওয়ারফেয়ার। তিনি জানতেন আমেরিকার সাথে সরাসরি লড়া কঠিন, তাই তিনি প্রক্সি বা মিত্র বাহিনীর শক্তি বাড়িয়েছিলেন। হিজবুল্লাহ থেকে শুরু করে হামাস এবং ইরাকের হাশদ আল-শাবি—সবাইকে তিনি এক সুতোয় গেঁথেছিলেন। আজ এই বাহিনীগুলোই ইসরায়েলকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। এই 'অক্ষশক্তি' বা অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স হলো সোলাইমানির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
২০২০ সালের ৩রা জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে তাকে কাপুরুষোচিতভাবে ড্রোন হামলায় শহীদ করা হয়। ট্রাম্প ভেবেছিলেন সোলাইমানিকে সরিয়ে দিলে ইরান দুর্বল হয়ে যাবে। কিন্তু ট্রাম্পের সেই হিসাব ছিল ভুল। সোলাইমানির শাহাদাত ইরানের মানুষকে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে এবং কুদ্স ফোর্স এখন দ্বিগুণ শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। সোলাইমানি আজ একজন ব্যক্তি নন, তিনি আজ কোটি কোটি তরুণের এক আদর্শিক লড়াইয়ের নাম।
কুদ্স ফোর্সের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এতটাই শক্তিশালী যে, বলা হয় সিআইএ বা মোসাদের অনেক গোপন বৈঠকের খবরও সোলাইমানির কাছে পৌঁছে যেত। তিনি শত্রুর ডেরায় ঢুকে তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে ওস্তাদ ছিলেন। ইরাকে আইসিসের (ISIS) বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি যেভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। কুর্দি নেতা মাসুদ বারজানি স্বীকার করেছিলেন যে, সোলাইমানি না থাকলে এরবিল আইসিসের দখলে চলে যেত।
সোলাইমানি ছিলেন একজন 'লিভিং মার্টিয়ার' বা জীবন্ত শহীদ। তিনি বিলাসিতা ত্যাগ করে ফ্রন্টলাইনে সৈন্যদের সাথে বসে খাবার খেতেন, বাংকারে রাত কাটাতেন। তার এই বিনয় এবং সাহস সৈন্যদের মনে এমন অনুপ্রেরণা যোগাত যে তারা হাসিমুখে শাহাদাত বরণ করতে প্রস্তুত থাকত। এই আধ্যাত্মিক শক্তিই কুদ্স ফোর্সকে অপরাজেয় করে তুলেছে। আমেরিকার যান্ত্রিক সৈন্যরা এই ইমানি শক্তির কাছে বারবার পরাজিত হয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন তিনি আসলে নিজের দেশের পতনের ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন। কারণ সোলাইমানির রক্ত এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিরোধী জোয়ার তৈরি করেছে। ইরাকের সংসদ ইতিমধ্যে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিল পাস করেছে। এটি সোলাইমানির সেই দীর্ঘমেয়াদী কৌশলেরই ফসল যা আমেরিকাকে এখন অপমানজনকভাবে এই অঞ্চল ত্যাগ করতে বাধ্য করছে।
কুদ্স ফোর্সের বর্তমান কমান্ডার ইসমাইল কানি ঠিক সোলাইমানির পথেই হাঁটছেন। তিনি অত্যন্ত নীরবে কিন্তু সুনিপুণভাবে সোলাইমানির অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করছেন। ইরানের অত্যাধুনিক ড্রোন এবং মিসাইল প্রযুক্তি এখন হিজবুল্লাহ ও হুথিদের হাতে পৌঁছে গেছে। এর ফলে ইসরায়েল এখন প্রতিদিন আতঙ্কে রাত কাটায়। সোলাইমানির রণকৌশল ছিল মূলত একটি 'লং গেম' যেখানে শেষ হাসি হাসবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বাশার আল-আসাদের সরকারকে রক্ষা করার পেছনে সোলাইমানির অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। যখন সারা বিশ্ব মনে করেছিল দামেস্কের পতন নিশ্চিত, তখন সোলাইমানি সেখানে গিয়ে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেন। তিনি রাশিয়াকে এই যুদ্ধে অন্তর্ভুক্ত করতে ভ্লাদিমির পুতিনকে রাজি করিয়েছিলেন। এই কূটনৈতিক ও সামরিক দূরদর্শিতা তাকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমরনায়কের আসনে বসিয়ে দিয়েছে যা পশ্চিমা বিশ্বকে ভাবিয়ে তোলে।
সোলাইমানির আরেকটি বড় কৌশল ছিল মাটির নিচের সুড়ঙ্গ বা টানেল নেটওয়ার্ক। গাজা থেকে লেবানন—সবখানেই তিনি এমন সব টানেল তৈরি করিয়েছিলেন যা দিয়ে আধুনিক রাডার ফাঁকি দিয়ে শত্রুকে আক্রমণ করা যায়। এই টানেলগুলোই আজ হামাস ও হিজবুল্লাহর প্রধান শক্তি। ইসরায়েল তাদের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি দিয়েও এই টানেলগুলো ধ্বংস করতে পারছে না। এটি সোলাইমানির সেই অদৃশ্য যুদ্ধের এক অসাধারণ সাফল্য।
ইসরায়েলকে ধ্বংস করার জন্য সোলাইমানি যে পরিকল্পনা করেছিলেন, তাকে বলা হয় 'রিং অফ ফায়ার' বা আগুনের বলয়। তিনি ইসরায়েলের চারপাশে এমনভাবে মিসাইল মোতায়েন করেছিলেন যে, একযোগে কয়েক হাজার মিসাইল ছোড়া সম্ভব। আজ ইসরায়েল যে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে, তার মূল কারিগর ছিলেন এই মহান জেনারেল। ট্রাম্পের মতো শাসকরা তাকে ভয় পেতেন কারণ সোলাইমানি কখনো কোনো চাপের কাছে মাথা নত করেননি।
শহীদ সোলাইমানি বলতেন, "আমরা যুদ্ধের জাতি, আমরা শাহাদাতের জাতি।" তার এই সাহসী বক্তব্য মার্কিনিদের মনে কাঁপন ধরিয়ে দিত। তিনি জানতেন কীভাবে শত্রুর মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় নিশ্চিত করতে হয়। আজ ইরানের প্রতিটি ঘরে সোলাইমানির ছবি শোভা পায়। তিনি আজ ইরানের জাতীয় বীর। ট্রাম্প তাকে হত্যা করে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন, আর সোলাইমানি অমর হয়ে আছেন মানুষের হৃদয়ে।
কুদ্স ফোর্স এখন সাইবার যুদ্ধেও পারদর্শী হয়ে উঠেছে। তারা আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ ইনফ্রাস্ট্রাকচারে হামলা চালিয়ে জানান দিচ্ছে যে তারাও পিছিয়ে নেই। সোলাইমানি কেবল অস্ত্রের লড়াই শেখাননি, তিনি আধুনিক যুগের সব ধরণের যুদ্ধের জন্য ইরানকে প্রস্তুত করে গেছেন। ফলে ইরান আজ কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে যা সাম্রাজ্যবাদকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
আমেরিকা এবং ইসরায়েল ভেবেছিল সোলাইমানি নেই মানে তাদের রাস্তা পরিষ্কার। কিন্তু তারা দেখছে এখন প্রতিটি ইরানি নাগরিকই একেকজন সোলাইমানি। তার আদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরে মার্কিন ও ইসরায়েলি জাহাজে সফল হামলা চালাচ্ছে। এটি সোলাইমানির সেই প্রশিক্ষণের ফল। আমেরিকার নৌ-আধিপত্য আজ ধুলোয় মিশে যাচ্ছে কেবলমাত্র সোলাইমানির দেওয়া সাহসের কারণে।
সোলাইমানির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল অতুলনীয়। তিনি জানতেন কখন কার সাথে হাত মেলাতে হয়। তিনি শিয়া-সুন্নি ভেদাভেদ ভুলে পুরো মুসলিম উম্মাহকে এক করার চেষ্টা করেছিলেন। ফিলিস্তিনের সুন্নি মুসলিমদের জন্য তিনি যা করেছেন, তা অনেক আরব দেশও করতে পারেনি। এই কারণেই ফিলিস্তিনিরা তাকে 'জেরুজালেমের শহীদ' হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তিনি ছিলেন সকল মজলুম মানুষের কণ্ঠস্বর।
ট্রাম্পের ভুল নীতির কারণে আজ মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কোনো বন্ধু নেই। সৌদি আরব এবং ইরান এখন নিজেদের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন করছে, যা সোলাইমানির সেই স্বপ্নেরই অংশ ছিল—যেখানে বাইরের কোনো শক্তি ছাড়াই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বিরাজ করবে। আমেরিকার বিভাজন এবং শাসনের রাজনীতি এখন শেষ হয়ে আসছে। সোলাইমানির রক্ত বৃথা যায়নি, বরং তা এক নতুন সূর্যোদয়ের বার্তা নিয়ে এসেছে।
শেষে বলা যায়, জেনারেল কাসেম সোলাইমানি এবং কুদ্স ফোর্সের রণকৌশল কেবল যুদ্ধের ইতিহাস নয়, এটি একটি প্রতিরোধের মহাকাব্য। যারা মনে করেন অস্ত্র দিয়ে একটি জাতিকে কেনা যায়, তাদের জন্য সোলাইমানি এক বড় শিক্ষা। ইরান আজ গর্বিত কারণ তাদের এই বীর সন্তানের রক্তে রঞ্জিত জমিন আজ শত্রুদের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার পথে। সোলাইমানি বেঁচে থাকবেন তাঁর আদর্শে, তাঁর সাহসে।
দর্শক, আপনি কি মনে করেন জেনারেল সোলাইমানির শাহাদাত কি আমেরিকার পতনের সূচনা করেছে? ইরান কি পারবে সোলাইমানির সেই স্বপ্ন পূরণ করে ফিলিস্তিনকে মুক্ত করতে? আপনার মতামত আমাদের জানান।
