সাপের হাঁচি বেদেয় চেনে, আর পাহাড়ের পেটে লুকিয়ে থাকা বাজপাখি চেনে তার শিকারকে। শত্রু যখন আকাশ দেখে হাসে, ইরান তখন পাহাড়ের নিচ থেকে মরণ কামড় দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। আপনারা কি কল্পনা করতে পারেন, মাইলের পর মাইল বিস্তৃত এক পাহাড়ের পেটের ভেতর লুকিয়ে আছে আস্ত একটি বিমান ঘাঁটি? যেখানে বিশাল রানওয়ে, ফুয়েল ডিপো এবং অত্যাধুনিক সব যুদ্ধবিমান সাজানো রয়েছে এমনভাবে, যা কোনো স্যাটেলাইট বা রাডারে ধরা পড়ে না? এটি কোনো হলিউডি সিনেমার দৃশ্য নয়, এটি ইরানের অত্যন্ত গোপন 'ইগল-৪৪' বা 'ওঘাব-৪৪' ঘাঁটি। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের ওপর বিমান হামলার হুমকি দেন, তখন তিনি হয়তো জানেন না যে তার আগেই পাহাড়ের নিচ থেকে গর্জে উঠবে ইরানের এই ভয়ঙ্কর শিকারি ইগলরা। আজ আমরা আপনাদের নিয়ে যাবো ইরানের সেই অজেয় ভূগর্ভস্থ বিমান ঘাঁটির অন্দরে।
ইরানের সামরিক কৌশল সব সময়ই পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এক গোলকধাঁধা। তারা যখন মনে করে ইরানকে অবরোধ দিয়ে কোনঠাসা করা হয়েছে, তখনই ইরান এমন কিছু প্রকাশ করে যা পেন্টাগনের জেনারেলদের কপালে ঘাম ঝরিয়ে দেয়। ‘ইগল-৪৪’ হলো ইরানের বিমান বাহিনীর প্রথম ভূগর্ভস্থ কৌশলগত ঘাঁটি। এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে পৃথিবীর কোনো বাঙ্কার বাস্টার বোমা বা এমনকি পারমাণবিক হামলাও এই ঘাঁটির বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। পাহাড়ের কয়েকশ ফুট গভীরে এই ঘাঁটিটি ইরানের সার্বভৌমত্বের এক দুর্ভেদ্য ঢাল।
এই ঘাঁটির ভিডিও যখন প্রথম প্রকাশ করা হয়, তখন পুরো বিশ্ব হতবাক হয়ে গিয়েছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, মাইলের পর মাইল দীর্ঘ টানেলের ভেতর দিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে ‘ফ্যান্টম’ এবং ‘সুখোই’ এর মতো শক্তিশালী সব যুদ্ধবিমান। এই টানেলগুলো এতই চওড়া যে আস্ত একটি যুদ্ধবিমান অনায়াসেই এর ভেতর দিয়ে চলাচল করতে পারে। এটি কেবল একটি ঘাঁটি নয়, এটি ইরানের সেই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ যা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চিরতরে বিদায় করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
ইগল-৪৪ ঘাঁটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর গোপনীয়তা। এটি পাহাড়ের একদম গভীরে অবস্থিত হওয়ায় শত্রুপক্ষ চাইলেও কোনো নিখুঁত হামলা চালাতে পারবে না। এখান থেকে যুদ্ধবিমানগুলো সরাসরি টানেলের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসে আকাশে ডানা মেলতে পারে। আক্রমণ শেষে আবার চোখের পলকে পাহাড়ের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন যখন ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোর তালিকা তৈরি করে, তারা হয়তো কল্পনাই করতে পারেনি যে পাহাড়ের নিচে আস্ত এক বিমানবন্দর তেহরান গড়ে তুলেছে।
ঘাঁটির ভেতর কেবল যুদ্ধবিমান নয়, বরং রয়েছে বিশাল সব ডোরন হ্যাঙ্গার। ইরানের ভয়ঙ্কর সব শাহেদ এবং মোহাজের ড্রোনগুলো এখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়। এছাড়া রয়েছে বিশাল সব জ্বালানি ট্যাংক এবং অস্ত্রাগার। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু হলে বাইরের সব সাপ্লাই চেইন বন্ধ হয়ে গেলেও এই ঘাঁটিটি মাসের পর মাস স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে টিকে থাকতে পারবে। এই সক্ষমতাই ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের অপরাজেয় শক্তিতে পরিণত করেছে। ট্রাম্পের আস্ফালন এই পাহাড়ের দেয়ালের কাছে এসে আজ স্তব্ধ হয়ে গেছে।
ইরানের জেনারেলরা জানিয়েছেন, ইগল-৪৪ ঘাঁটিতে এমন সব ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম রয়েছে যা শত্রুর সব যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। এই ঘাঁটির রাডার সিস্টেম বাইরের যেকোনো অনুপ্রবেশকারীকে কয়েকশ মাইল দূর থেকেই শনাক্ত করতে সক্ষম। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ অনেক চেষ্টা করেও এই ঘাঁটির সঠিক হদিস বের করতে পারেনি। এটি ইরানের সেই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় যা প্রমাণ করে যে, কেবল অস্ত্র দিয়ে নয়, মেধা দিয়েও যুদ্ধ জয় করা সম্ভব।
মাটির নিচে এই ধরণের অবকাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ কাজ। ইরান বছরের পর বছর ধরে নীরবে এই কাজগুলো সম্পন্ন করেছে। আজ যখন আমেরিকা ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে, তখন ইগল-৪৪ এর মতো ঘাঁটিগুলো ইরানের জন্য ‘সেকেন্ড স্ট্রাইক’ সক্ষমতা নিশ্চিত করছে। অর্থাৎ প্রথম দফার হামলায় ইরানের ওপরের স্থাপনা ধ্বংস হলেও, পাহাড়ের নিচ থেকে ইরান এমন প্রতিশোধ নেবে যা শত্রুর অস্তিত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে।
পেন্টাগনের সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইগল-৪৪ এর রানওয়েগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে অতি দ্রুততম সময়ে বিমানগুলো উড্ডয়ন করতে পারে। এই গতিশীলতাই হলো যুদ্ধের ময়দানে আসল চাবিকাঠি। ড্রোন প্রযুক্তিতে ইরানের যে বিশ্বজয়, তার কেন্দ্রবিন্দু হলো এই ধরণের গোপন ঘাঁটিগুলো। এখান থেকে পরিচালিত ড্রোনগুলো লোহিত সাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত যেকোনো মার্কিন রণতরীকে মুহূর্তের মধ্যে ডুবিয়ে দিতে সক্ষম। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি আজ ইরানের এই পাহাড়ের নিচে এসে হার মেনেছে।
ইরানের জনগণ তাদের সামরিক শক্তির এই অগ্রগতি দেখে গর্বিত। তারা জানে যে তাদের দেশ আজ আর কারো দয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। ইগল-৪৪ ঘাঁটিটি ইরানের বিজ্ঞানীদের মেধা আর রেভল্যুশনারি গার্ডের সাহসের এক অনন্য মিশেল। যেখানে আমেরিকা তার মিত্রদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে পকেট ভারী করছে, ইরান সেখানে নিজেদের শ্রম দিয়ে তিলে তিলে এই অজেয় শক্তি গড়ে তুলেছে। এটি কেবল একটি ঘাঁটি নয়, এটি ইরানের স্বাধীনতার প্রতীক যা কোনো অপশক্তির কাছে মাথা নত করবে না।
ইসরায়েল প্রায়ই বুক ফুলিয়ে বলে যে তারা ইরানের যেকোনো স্থাপনায় হামলা করতে পারে। কিন্তু ইগল-৪৪ এর কথা শুনে তারা এখন মুখে কুলুপ এঁটেছে। কারণ তারা জানে, এই পাহাড় ফুড়ে ভেতরে ঢোকার প্রযুক্তি তাদের কাছে নেই। উল্টো পাহাড়ের ভেতর থেকে ধেয়ে আসা মিসাইল আর যুদ্ধবিমানের মোকাবিলা করা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। ইরান আজ প্রমাণ করেছে যে তারা কেবল আত্মরক্ষা করতে জানে না, বরং শত্রুকে তাদের ডেরায় ঢুকে আঘাত করার ক্ষমতাও রাখে।
ইগল-৪৪ এর ভেতরে রয়েছে অত্যাধুনিক মেরামত কেন্দ্র এবং কমান্ড সেন্টার। এখান থেকেই সরাসরি ইরানের সর্বোচ্চ কমান্ডের সাথে যোগাযোগ রাখা হয়। প্রতিটি টানেল এবং সেকশন এমনভাবে সুরক্ষিত যে কোনো রাসায়নিক বা জৈবিক হামলাও এখানে কার্যকর হবে না। ইরানের এই প্রস্তুতি কোনো দেশকে আক্রমণ করার জন্য নয়, বরং আগ্রাসীদের হাত থেকে নিজের মাটিকে রক্ষা করার জন্য। কিন্তু যদি ট্রাম্প ভুল পথে হাঁটেন, তবে এই পাহাড়ের ইগলরা শিকারি হয়ে আকাশে ডানা মেলবে।
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে ইরান এখন এক বড় খেলোয়াড়। ইগল-৪৪ এর মতো গোপন ঘাঁটিগুলো ইরানকে সেই আত্মবিশ্বাস দিয়েছে যা দিয়ে তারা বিশ্ব পরাশক্তিদের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে। ইরান আজ প্রমাণ করেছে যে সত্যের পথে থাকলে এবং জনগণের সমর্থন থাকলে কোনো নিষেধাজ্ঞাই একটি জাতিকে পঙ্গু করতে পারে না। ট্রাম্পের সময়কাল হয়তো শেষ হয়ে আসবে, কিন্তু ইরানের এই ইগলরা অনন্তকাল আকাশ পাহারা দেবে। এটি বীরত্বের এক নতুন সংজ্ঞা যা তেহরান বিশ্বকে শিখিয়েছে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধে এই ধরণের আন্ডারগ্রাউন্ড এয়ারবেসগুলোই হবে যুদ্ধের প্রধান টার্নিং পয়েন্ট। ইরান ইতিমধ্যে ইগল-৪৪ এর মতো আরও বেশ কয়েকটি ঘাঁটির কাজ শেষ করেছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। আমেরিকা ও ইসরায়েলের গোয়েন্দারা এখন কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তাদের পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। কিন্তু ইরানের আসল শক্তি সবসময়ই লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকে। এই রহস্যময়তাই ইরানকে আজকের অজেয় অবস্থানে নিয়ে এসেছে যা সাম্রাজ্যবাদের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে।
শেষে বলা যায়, ‘ইগল-৪৪’ হলো ইরানের সেই তুরুপের তাস যা যুদ্ধের ময়দানে শত্রুকে নিস্তব্ধ করে দেবে। পাহাড়ের নিচে লুকানো এই সামরিক সক্ষমতা আজ ইরানের সার্বভৌমত্বের গ্যারান্টি। যারা ইরানকে দুর্বল ভেবেছিল, ইগল-৪৪ তাদের জন্য এক বিশাল সতর্কবার্তা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি আর ইসরায়েলের ষড়যন্ত্রের মুখে ইরানের এই গোপন সাম্রাজ্য এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। ইরান আজ অপরাজেয় এবং তার আকাশ এখন মাটির নিচ থেকে আসা বীরদের সুরক্ষায় সম্পূর্ণ নিরাপদ—এটিই ধ্রুব বাস্তব সত্য।
দর্শক, ইরানের এই রহস্যময় ভূগর্ভস্থ ‘ইগল-৪৪’ ঘাঁটি নিয়ে আপনার মতামত কী? আমেরিকা কি সত্যিই পারবে এই পাহাড় ফুড়ে ইরানি ইগলদের দমাতে? আপনার মূল্যবান কমেন্ট আমাদের জানান।
