একটি পুরনো প্রবাদ আছে— "বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো।" ইউক্রেন এবং তাদের পশ্চিমা দোসররা এতদিন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধের পাহাড় গড়ে তোলার গল্প শুনিয়েছিল, আজ ডনবাসের রণক্ষেত্রে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। বিশেষ করে পোক্রোভস্কের ঘন কুয়াশা যখন রণক্ষেত্রকে ঢেকে দিচ্ছে, তখন রাশিয়ার সুনিপুণ সমরকৌশলের সামনে ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিটি পদক্ষেপই তাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
স্বাগতম আমাদের চ্যানেলে। আজ আমরা বিশ্লেষণ করবো কেন পোক্রোভস্কের এই যুদ্ধ ইউক্রেনের জন্য কফিনের শেষ পেরেক হতে যাচ্ছে এবং কীভাবে পুতিনের রাশিয়া ধাপে ধাপে তাদের লক্ষ্য পূরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
পোক্রোভস্ক শুধু একটি শহর নয়, এটি ইউক্রেনীয় সামরিক লজিস্টিকসের হৃদপিণ্ড। ডনবাস অঞ্চলে কিয়েভের সেনাদের রসদ সরবরাহ এবং অস্ত্র পাঠানোর মূল রাস্তাগুলো এই শহরের ওপর দিয়েই গেছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকরাও স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, পোক্রোভস্কের পতন মানে পুরো ডনবাস অঞ্চলে ইউক্রেনের পরাজয়।
রাশিয়া অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই শহরটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ১লা ফেব্রুয়ারির তথ্য অনুযায়ী, পোক্রোভস্ক অভিমুখে রাশিয়ার অগ্রযাত্রা এখন অপ্রতিরোধ্য। যদিও কিয়েভ দাবি করছে তারা কিছু আক্রমণ প্রতিহত করেছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, রুশ বাহিনীর চাপে ইউক্রেনীয় সেনারা এখন পালানোর পথ খুঁজছে।
শীতকালীন কুয়াশা যেখানে ইউক্রেনের ড্রোন এবং নজরদারি ব্যবস্থাকে অচল করে দিচ্ছে, সেখানেই রাশিয়ার সেনারা এই প্রাকৃতিক পরিবেশকে নিজেদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা সিভিলিয়ান যানবাহন, এটিভি এবং মোটরসাইকেল ব্যবহার করে অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতিতে ইউক্রেনীয় বাংকারগুলোতে আঘাত হানছে। কিয়েভের প্রোপাগান্ডা মেশিন হয়তো একে "হতাশা" বলছে, কিন্তু সামরিক বিজ্ঞানে একে বলা হয় 'সারপ্রাইজ অ্যাটাক'।
ইউক্রেন দাবি করছে তারা রাশিয়ার অনেক সেনাকে হতাহত করেছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির খবর সবসময় অতিরঞ্জিত করে প্রচার করে কিয়েভ, যাতে পশ্চিমা সাহায্য বন্ধ না হয়। প্রকৃতপক্ষে, ইউক্রেনের ১৫৫তম মেকানাইজড ব্রিগেড বা স্পার্টান বিগ্রেড—যারাই রাশিয়ার সামনে দাঁড়াচ্ছে, তারাই চরম ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। রাশিয়ার প্রতিটি আক্রমণ ইউক্রেনীয় ডিফেন্স লাইনকে জীর্ণ-শীর্ণ করে দিচ্ছে।
মেডুসা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র বলছে, পোক্রোভস্কের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত রিশিনোয়া বা রাশা গ্রামটি এখন রাশিয়ার নিশানায়। এটি ইউক্রেনের উত্তর দিকের প্রধান লজিস্টিক হাব। এই গ্রামটির দখল নিতে পারা মানে পোক্রোভস্কের ইউক্রেনীয় সেনাদের সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলা। রাশিয়া ইতিমধ্যে এই অঞ্চলে তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছে। কিয়েভের সেনারা এখন খোলা প্রান্তরে ইঁদুরের মতো আটকা পড়েছে, যেখানে রাশিয়ার বিমান হামলা ও কামানের গোলা থেকে বাঁচার কোনো সুযোগ নেই।
ডকুমেন্টেড ফ্যাক্টস বা নথিবদ্ধ তথ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, জেলেনস্কি প্রশাসন এখন কেবল সময় ক্ষেপণ করছে। রাশিয়ার লক্ষ্য হলো ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে সম্পূর্ণ ডনবাস মুক্ত করা। আর পোক্রোভস্কের বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, সেই লক্ষ্য সময়ের আগেই অর্জিত হতে পারে।
১. জনবল সংকট: ইউক্রেনীয় ব্রিগেডের জেনারেলরা স্বীকার করছেন যে তাদের সেনাদের মধ্যে ক্লান্তি এবং জনবলের তীব্র অভাব রয়েছে। বিপরীতে রাশিয়ার কাছে রয়েছে অফুরন্ত রিজার্ভ এবং আধুনিক সমরাস্ত্র।
২. মানসিক পরাজয়: পোক্রোভস্ক এখন একটি "ঘোস্ট টাউন" বা ভূতুড়ে শহরে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেনীয় সেনারা জানে যে সেখানে পাঠানো মানেই হলো নিশ্চিত মৃত্যু।
৩. পশ্চিমা ব্যর্থতা: ন্যাটোর দেওয়া দামি দামি অস্ত্র রাশিয়ার ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং ড্রোন টেকনোলজির সামনে অকেজো হয়ে পড়ছে।
রাশিয়া বারবার বলছে, এই অভিযান তাদের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য অপরিহার্য। ন্যাটো যেভাবে ইউক্রেনকে ব্যবহার করে রাশিয়ার দোরগোড়ায় অস্ত্র মজুদ করছিল, তার যোগ্য জবাব দিচ্ছে পুতিন বাহিনী। রাশিয়ার সেনারা কেবল জমি দখল করছে না, তারা একটি পশ্চিমা মদদপুষ্ট পুতুল সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে লড়াই করছে যারা নিজ দেশের সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের আগুনে ঠেলে দিয়েছে।
ইউক্রেনীয় মিডিয়া প্রায়ই দাবি করে যে তারা রাশিয়ার অসংখ্য ড্রোন ধ্বংস করছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রে দেখা যায়, পোক্রোভস্কের ভেতরে রুশ অনুপ্রবেশ ইতিমধ্যে ঘটে গেছে। গত নভেম্বরেই জেলেনস্কি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন যে কয়েকশ রুশ সেনা শহরে ঢুকে পড়েছে। এখন সেই সংখ্যা কয়েক হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। জেলেনস্কি শান্তির কথা বললেও তলে তলে পশ্চিমাদের কাছে আরও যুদ্ধের উস্কানি দিচ্ছেন, যা ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের ভাগ্যকে আরও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস জয়ীদের কথা বলে। পোক্রোভস্কের এই যুদ্ধ প্রমাণ করছে যে, সামরিক শক্তি এবং সঠিক কৌশলের কাছে পশ্চিমাদের প্রোপাগান্ডা বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারে না। রাশিয়া তাদের লক্ষ্যের দিকে অবিচল, আর ইউক্রেন এখন কেবল নিজেদের পতনের ক্ষণ গণনা করছে। শীতের এই কুয়াশা কেটে গেলে যখন বসন্ত আসবে, তখন হয়তো পোক্রোভস্কের আকাশ জুড়ে ওড়বে রাশিয়ার বিজয় নিশান।
আপনার কী মনে হয়? পোক্রোভস্কের পতন কি ইউক্রেন যুদ্ধের ইতি টানবে? আপনার মতামত কমেন্টে জানান।
