আমেরিকা আর ইসরাইল কি ভেবেছে একজন খামেনিকে সরিয়ে দিলেই ফুরিয়ে যাবে ইসলামি বিপ্লবের তেজ? কক্ষনো না! একটি নক্ষত্র ঝরে পড়লে আকাশে হাজারো নক্ষত্র জ্বলে ওঠে। আজ কথা বলবো সেই মহান নেতার উত্তরাধিকার এবং ইরানের অপরাজেয় শক্তি নিয়ে যা কাঁপিয়ে দিচ্ছে পশ্চিমা বিশ্বের ভিত।
কথায় আছে, 'বিপদ কখনও একা আসে না', কিন্তু বীরের রক্ত বৃথা যায় না। ১৯৭৯ সালের সেই ঐতিহাসিক বিপ্লবের পর থেকে ইরান যে সত্যের পথে চলছে, তাকে থামানোর সাধ্য কারো নেই। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছিলেন সেই সত্যের অতন্দ্র প্রহরী। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আর ইসরাইলি শয়তানি চক্রের কাপুরুষোচিত হামলায় তিনি আজ শহীদ। কিন্তু ইরানের প্রতিটি ইঞ্চি মাটি এখন প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে।
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। ৩৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এক হাতে সামলেছেন দেশের শাসনভার, অন্য হাতে রুখে দিয়েছেন পশ্চিমা ষড়যন্ত্র। ১৯৮৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি ইরানকে সামরিক এবং প্রযুক্তিগতভাবে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যে, আজ বড় বড় শক্তিগুলো ইরানের নাম শুনলে থরথর করে কাঁপে।
সংবিধানের ১১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্র থেমে থাকে না। বর্তমানে তিন সদস্যের একটি শক্তিশালী পরিষদ সাময়িকভাবে দেশের নেতৃত্বের হাল ধরেছে। এই পরিষদে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন জুরিস্ট। তারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন যাতে শয়তান রাষ্ট্রগুলো কোনো সুযোগ নিতে না পারে। তবে তাদের ক্ষমতা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত, যেমন যুদ্ধের ঘোষণা বা শান্তির চুক্তি, নিতে হলে 'এক্সপ্ল্যানেটরি কাউন্সিল'-এর বড় অংশের সমর্থন প্রয়োজন হয়। এর মানে হলো, ইরানের ক্ষমতা কোনো একক ব্যক্তির খেয়ালখুশিতে চলে না, বরং এটি একটি সুসংগঠিত এবং শক্তিশালী ব্যবস্থা। পশ্চিমা মিডিয়া বিভ্রান্তি ছড়ালেও সত্য এটাই যে, ইরানের প্রতিটি বাহিনী এবং প্রতিষ্ঠান এখন আগের চেয়েও বেশি ঐক্যবদ্ধ এবং যেকোনো হামলা মোকাবিলায় পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং গণতান্ত্রিক। এখানে ৮৮ জন বিজ্ঞ আলেমের সমন্বয়ে গঠিত 'সুপ্রিম লিডার্স কাউন্সিল' বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ নতুন নেতা নির্বাচন করেন। প্রতি আট বছর পর সাধারণ মানুষের ভোটে এই পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হন। এর অর্থ হলো, সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতার মূলে রয়েছে সাধারণ জনগণের সমর্থন। বর্তমান সংকটকালীন সময়ে এই পরিষদ এখন নতুন যোগ্য নেতা নির্বাচনে ব্যস্ত।
সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য বিশেষ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার প্রয়োজন হয়। যদিও খামেনি নির্বাচিত হওয়ার সময় নিয়ম কিছুটা শিথিল করা হয়েছিল, কিন্তু তার প্রজ্ঞা প্রমাণ করেছে যে তিনি পদের চেয়েও বড় ছিলেন। বর্তমান কাউন্সিলে এমন অনেক যোগ্য আলেম রয়েছেন যারা আমেরিকা ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে সক্ষম। ইরানের এই শক্তিশালী নেতৃত্বই বিশ্বের শোষিত মানুষের একমাত্র ভরসার স্থল হিসেবে এখনো টিকে আছে।
বর্তমানে বিশেষজ্ঞ পরিষদের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ আলী মোহিদি কেরমানির মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। তাদের সাথে আছেন হাশেম হোসেইনি বুশেহরির মতো দূরদর্শী নেতারা। এই পরিষদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য উপস্থিত থাকলেই নতুন নেতার নাম ঘোষণা করা সম্ভব। তারা জানেন, এই মুহূর্তে এমন একজন নেতা প্রয়োজন যিনি ইসরাইলকে মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়ার সাহস রাখবেন এবং মার্কিন দাদাগিরিকে বুড়ো আঙুল দেখাবেন।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি বিশেষ কমিশন কাজ করছে। এতে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের অভিজ্ঞ সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। আহমেদ হোসেইনি খোরাসানি এবং আলী রেজা উর্ফির মতো বিজ্ঞ ব্যক্তিরা এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছেন। তারা কেবল একজন নেতা খুঁজছেন না, তারা খুঁজছেন এমন এক সিংহহৃদয় মানুষকে, যিনি শহীদ খামেনির অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করবেন এবং আল-আকসা মুক্ত করার যুদ্ধে নেতৃত্ব দেবেন ইনশাআল্লাহ।
১৯৮৯ সালে যখন আয়াতুল্লাহ খোমেনি মৃত্যুবরণ করেন, তখন বিশ্ব ভেবেছিল ইরান ভেঙে পড়বে। কিন্তু তার পরদিনই পরিষদ অত্যন্ত দ্রুততার সাথে আলী খামেনিকে নির্বাচিত করে বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি এতই মজবুত যে, কোনো ঘাতকের বুলেট বা ক্ষেপণাস্ত্র এই বিপ্লবের জয়যাত্রাকে থামাতে পারবে না। ইরান খুব দ্রুতই তাদের নতুন নেতার নাম বিশ্ববাসীর সামনে ঘোষণা করবে।
ইরানের সংবিধানের ৫৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনসভা, বিচার বিভাগ এবং প্রশাসন সবই উম্মাহর নেতৃত্বের অধীনে পরিচালিত হয়। এই সর্বোচ্চ নেতা কেবল দেশের শাসক নন, তিনি হলেন ইসলামী বিপ্লবের জীবন্ত প্রতীক। তার ওপর নজরদারি করার সুযোগ থাকলেও, তিনি জাতীয় নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের প্রশ্নে শেষ কথা বলেন। তার একটি ইশারায় লাখ লাখ মুজাহিদ জীবন দিতে প্রস্তুত, যা পশ্চিমাদের জন্য বড় আতঙ্কের কারণ।
সর্বোচ্চ নেতা হলেন ইরানের সব সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। বিশেষ করে বিপ্লবী গার্ডস বা আইআরজিসি সরাসরি তার নির্দেশে চলে। যুদ্ধ ঘোষণা বা শান্তির ডিক্রি জারি করার একমাত্র অধিকার তার। আমেরিকা ও ইসরাইল ভালো করেই জানে যে, ইরানের নেতার একটি মাত্র আদেশ তাদের মধ্যপ্রাচ্যের সব ঘাঁটি ধ্বংস করে দিতে পারে। এই ভয়েই তারা সরাসরি যুদ্ধে না এসে কাপুরুষের মতো গুপ্তহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিচার বিভাগের প্রধান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রধান—সবাইকে নিয়োগ দেন এই সর্বোচ্চ নেতা। এমনকি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকেও তার কাজ শুরু করতে নেতার অনুমোদন নিতে হয়। এই সংহত ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যে, দেশের ক্ষমতা কোনো পশ্চিমা পাপেট বা দালালের হাতে যাবে না। খামেনি এই ব্যবস্থাটিকে এমনভাবে সাজিয়ে গেছেন যে, দেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং শত্রুর মোকাবেলায় অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।
ইসরাইল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছে তারা জয়ী হয়েছে, কিন্তু আসলে তারা নিজেদের ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করেছে। ইরানের প্রতিটি রক্তকণা এখন প্রতিরোধের মন্ত্রে উজ্জীবিত। খামেনির শাহাদাত কেবল ইরান নয়, সারা বিশ্বের মুসলমানদের জাগিয়ে তুলেছে। ফিলিস্তিন থেকে ইয়েমেন, লেবানন থেকে ইরাক—সব জায়গার প্রতিরোধ যোদ্ধারা এখন এক পতাকার নিচে। শত্রুদের পরাজয় এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র, তাদের পালানোর পথ থাকবে না।
ইরান এখন তার ইতিহাসের এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। খুব শীঘ্রই এমন একজন নেতা আবির্ভূত হবেন যিনি শহীদদের রক্তের বদলা নেবেন। ইসরাইলি সন্ত্রাসবাদ এবং মার্কিন আধিপত্যবাদের দিন শেষ হয়ে আসছে। ইসলামী এই বিপ্লব কেবল ইরানের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, এটি সারা বিশ্বের মজলুম মানুষের মুক্তির সনদ। ইনশাআল্লাহ, খুব শীঘ্রই তেহরানের আকাশে বিজয়ের পতাকা উড়বে এবং অপশক্তির পরাজয় বিশ্ববাসী চাক্ষুষভাবে দেখতে পাবে।
দর্শক, সত্যের পথ সব সময়ই কণ্টকাকীর্ণ, কিন্তু শেষ হাসিটা সত্যপন্থীরাই হাসে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির আদর্শ আমাদের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান থাকবে। পশ্চিমা শক্তিরা যতই ষড়যন্ত্র করুক, ইরানের এই অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না। শহীদদের রক্ত বৃথা যাবে না, ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুতই আমরা এক শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ ইসলামী বিশ্বের উত্থান দেখব।
