একটা প্রবাদ আছে, 'শেয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দেওয়া'। আমেরিকা আর ইসরায়েল যখন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির কথা বলে, তখন ঠিক এই প্রবাদটাই মনে পড়ে। কিন্তু এবার তারা নিয়ে এসেছে তাদের সবচেয়ে আধুনিক পিআরএসএম ব্যালিস্টিক মিসাইল। ইরানের ওপর এই প্রথম ব্যবহার করা হলো এটি। কিন্তু সত্যিই কি আধুনিক অস্ত্র দিয়ে ইরানের তেজ কমানো সম্ভব?

'ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়'—এই চিরন্তন সত্যটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো প্রায়ই ভুলে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বিনষ্টকারী আমেরিকা ও তাদের দোসর ইসরায়েল এবার নতুন এক খেলায় মেতেছে। তারা ইরানের পবিত্র ভূমিতে আঘাত হানার জন্য তাদের সর্বাধুনিক 'প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল' বা পিআরএসএম (PrSM) এর প্রথম যুদ্ধকালীন মহড়া চালিয়েছে। একে তারা বলছে 'অপারেশন এপিক ফিউরি', যা আসলে একটি নগ্ন আগ্রাসন।

আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম সম্প্রতি কিছু ছবি এবং ভিডিও প্রকাশ করেছে, যা বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, তাদের বিখ্যাত হাইমার্স লঞ্চার থেকে পিআরএসএম মিসাইল উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি তাদের পুরনো আটাকমস (ATACMS) মিসাইলের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী এবং দূরপাল্লার। আমেরিকার দাবি, এটি অন্তত ৫০০ থেকে ১০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।

ইসরায়েলের মদদে পরিচালিত এই অপারেশনের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের আত্মরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেওয়া। আমেরিকা মনে করছে, তাদের এই আধুনিক প্রযুক্তি ইরানকে ভয় পাইয়ে দেবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, ইরান কোনো সাধারণ দেশ নয়। তারা বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করে আসছে। এই নতুন মিসাইল ব্যবহারের মাধ্যমে আমেরিকা আসলে নিজের অসহায়ত্বই প্রকাশ করছে।

পিআরএসএম মিসাইলটি শব্দের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দ্রুত গতিতে চলতে পারে। এটি ভূমি থেকে উৎক্ষেপণ করে আকাশপথ দিয়ে এসে লক্ষ্যবস্তুকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। আমেরিকার সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের মাটির নিচে থাকা গোপন বাংকার এবং রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস করতেই তারা এটি ব্যবহার করছে। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছে, ইরানের ড্রোন এবং মিসাইল প্রযুক্তিও বর্তমানে বিশ্বের যেকোনো শক্তির জন্য বড় হুমকি।

এই যুদ্ধের ময়দানে আমেরিকা তাদের প্রযুক্তির বড়াই করলেও, বাস্তবতা হলো তারা ইরানের শক্তিমত্তাকে ভয় পায়। তাই সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে না এসে তারা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর ভরসা করছে। পিআরএসএম মিসাইলটি হাইমার্স ট্রাক থেকে সহজেই ছোড়া যায়, যা যুদ্ধের ময়দানে গতিশীলতা প্রদান করে। তবে ইরানের আকাশসীমা এবং তাদের নিজস্ব ডিফেন্স সিস্টেম এই উন্নত মিসাইলকেও রুখে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

পিআরএসএম বা এই জাতীয় আধুনিক মরণাস্ত্রের প্রয়োগ কেবল ইরানের জন্য নয়, পুরো মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমেরিকা এবং ইসরায়েল চায় মধ্যপ্রাচ্যের প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করতে এবং স্বাধীন দেশগুলোকে গোলাম বানিয়ে রাখতে। কিন্তু ইরানের এই প্রতিরোধ যুদ্ধে জয় হবে সত্যেরই। অস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে কোনো জাতিকে যে দাবিয়ে রাখা যায় না, তা আমেরিকা ভিয়েতনামে আগেই দেখেছে।

আমেরিকার এই অপারেশন আসলে একটি ষড়যন্ত্রের অংশ, যা ইসরায়েলকে সুরক্ষিত রাখার জন্য সাজানো হয়েছে। তারা বলছে এই মিসাইল আরও উন্নত করা হবে, যা জাহাজ ধ্বংস করতেও সক্ষম। কিন্তু ইরানের নৌবাহিনী পারস্য উপসাগরে এতটাই শক্তিশালী যে, সেখানে মার্কিন রণতরীগুলো সবসময় তটস্থ থাকে। প্রযুক্তির লড়াইয়ে আমেরিকা এগিয়ে থাকলেও, দেশপ্রেম এবং ঈমানি শক্তির লড়াইয়ে ইরান সবসময়ই তাদের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে।

শেষে বলা যায়, আমেরিকার পিআরএসএম মিসাইল হয়ত যান্ত্রিকভাবে উন্নত, কিন্তু তা ইরানের জনগণের মনোবল ভাঙার জন্য যথেষ্ট নয়। ইতিহাস আমাদের শেখায়, যখন কোনো জাতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন কোনো মিসাইল বা যুদ্ধবিমানই তাদের থামাতে পারে না। আমেরিকা এবং ইসরায়েলের এই জোটবদ্ধ আক্রমণ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আগুনকেই আরও উসকে দিচ্ছে, যার ফল হবে তাদের জন্যই অত্যন্ত ভয়াবহ।

news