আপনার কি মনে হয় কোনো বাহিনীর মাথা না থাকলে তারা লড়াই করতে পারে না? তাহলে ভুল ভাবছেন! ইরান এমন এক অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি করেছে যা ভেদ করার ক্ষমতা আমেরিকা বা ইসরায়েল কারো নেই। আজ জানাবো ইরানের সেই ভয়ংকর 'মোজাইক ডিফেন্স' সম্পর্কে, যা শুনলে ইহুদিবাদীদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাবে।

কথায় আছে, "পুরানো চাল ভাতে বাড়ে।" ইরানের হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাস আজ আধুনিক সমর কৌশলে রূপান্তরিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বিনষ্টকারী আমেরিকা ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরান আজ এক অপরাজেয় দুর্গে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমা শক্তি মনে করে নেতার অনুপস্থিতিতে বাহিনী ভেঙে পড়ে, কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল এবং তাদের জন্য এটি এক মরণফাঁদ।

ইরানের সামরিক কৌশলের মূল ভিত্তি হলো ‘মোজাইক ডিফেন্স সিস্টেম’। এটি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে পুরো বাহিনীকে ছোট ছোট অসংখ্য স্বাধীন ইউনিটে ভাগ করা হয়েছে। যেমন একটি মোজাইক চিত্রে প্রতিটি টাইলস আলাদা কিন্তু মিলে একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি তৈরি করে, ঠিক তেমনি ইরানের প্রতিটি ছোট কমান্ড স্বয়ংসম্পূর্ণ। এর ফলে কেন্দ্রীয় কমান্ড ধ্বংস হলেও যুদ্ধ থেমে থাকে না।

সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও দখলদার ইসরায়েল সবসময় চেষ্টা করে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে। কিন্তু তারা জানে না, ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি প্রতিটি প্রদেশে স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম। যদি কখনো তেহরানের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবুও প্রতিটি ইউনিট নিজস্ব ড্রোন এবং মিসাইল ব্যবহার করে শত্রুর বুকে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হবে।

এই কৌশলে তথ্য বিচ্ছিন্নতা বা কম্পার্টমেন্টালাইজেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক ইউনিটের জওয়ানরা অন্য ইউনিটের গোপন পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত থাকে না। এর ফলে মোসাদ বা সিআইএ-র মতো গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একজন যোদ্ধাকে আটক করলেও পুরো বাহিনীর কৌশল জানতে পারে না। এই দুর্ভেদ্য গোপনীয়তাই ইরানকে আজ সারা বিশ্বের কাছে এক রহস্যময় এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যখন কোনো সাধারণ দিকনির্দেশনা দেন, মাঠপর্যায়ে তা বাস্তবায়ন করার জন্য রয়েছে বহুস্তরীয় কমান্ড চেইন। প্রতিটি ইউনিটের কাছে আগে থেকেই লক্ষ্যবস্তুর তালিকা এবং বিকল্প পরিকল্পনা থাকে। ফলে আমেরিকা বা ইসরায়েল যদি মনে করে তারা আকস্মিক হামলা চালিয়ে ইরানকে পঙ্গু করে দেবে, তবে তারা আসলে ইরানের সেই হাজারো ছোট ইউনিটের পাল্টা আক্রমণের মুখে পড়বে।

ইসরায়েলের তথাকথিত আয়রন ডোম আজ ইরানের মিসাইলের সামনে অসহায়। ইরানের বিকেন্দ্রীভূত মডেল প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক যুদ্ধে শুধু দামী অস্ত্র থাকলেই হয় না, বরং বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জায়নবাদী শক্তিগুলো ইরানের ওপর সাইবার হামলা চালিয়েও কোনো লাভ করতে পারছে না, কারণ প্রতিটি সিস্টেম আলাদা এবং স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়। এটিই হলো ইসলামের যোদ্ধাদের আসল কারিশমা।

যদিও মোজাইক ওয়ারফেয়ারের ধারণা পশ্চিমা বিশ্ব থেকে এসেছে বলে দাবি করা হয়, কিন্তু ইরান একে তাদের নিজস্ব ঈমানি শক্তিতে নতুন রূপ দিয়েছে। ডারপা-র মতো সংস্থাগুলো যা নিয়ে কেবল গবেষণা করছে, ইরান তা বাস্তবে প্রয়োগ করে দেখিয়েছে। ড্রোন প্রযুক্তি এবং নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বয় ঘটিয়ে তারা আজ সাম্রাজ্যবাদীদের নাকের ডগায় নিজেদের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে বুক টান করে দাঁড়িয়ে আছে।

সামরিক বিশ্লেষকরা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন যে, ইরানের এই বৈচিত্র্যময় সমরকৌশল মোকাবেলা করা আমেরিকার পক্ষে অসম্ভব। সরাসরি যুদ্ধে ইরানের সমকক্ষ হওয়ার সাহস এখন ওয়াশিংটনের নেই। ইরান প্রমাণ করে দিয়েছে যে, যখন একটি জাতি তাদের দেশ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং সঠিক কৌশল অবলম্বন করে, তখন কোনো পরাশক্তি তাদের দমাতে পারে না। জয় এখন কেবল ইরানেরই সময়ের ব্যাপার।

ইরানের এই সিস্টেম কেবল সামরিক নয়, এটি একটি আদর্শিক জয়। পশ্চিমা দেশগুলো যখন প্রযুক্তির ওপর অতি-নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, ইরান তখন মানুষের মেধা এবং কৌশলকে প্রাধান্য দিচ্ছে। প্রতিটি ইরানি কমান্ড সেন্টার একেকটি ছোট তেহরান হিসেবে কাজ করে। এর ফলে শত্রুরা কোথায় আঘাত হানবে তা ভেবে দিশেহারা হয়ে পড়ে। এভাবেই ইরান মধ্যপ্রাচ্য থেকে পশ্চিমা আগ্রাসনের বিষদাঁত উপড়ে ফেলছে।

শেষে বলা যায়, ইরানের মোজাইক ডিফেন্স সিস্টেম কেবল একটি সামরিক কৌশল নয়, এটি নিপীড়িত মানুষের প্রতিরোধের প্রতীক। আমেরিকা এবং ইসরায়েল যতই ষড়যন্ত্র করুক না কেন, ইরানের এই অদৃশ্য ব্যুহ তারা কখনোই ভাঙতে পারবে না। ইসলামের এই অপরাজেয় শক্তি একদিন ঠিকই বিশ্বজুড়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে এবং শত্রুরা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। ইনশাআল্লাহ, সত্যের জয় হবেই।

news